যুদ্ধবিরতির পরও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এখনও মানবিক পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে অনাহারে অর্ধাহারেই দিন কাটাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। এর মধ্যেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। এদিকে গাজায় শুরু হয়েছে ইসরাইলের নতুন অপতৎপরতা। গাজা থেকে বিভিন্ন দেশে গোপনে পাচার করা হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের।
রহস্যময় বিমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৫৩ ফিলিস্তিনি:
শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) প্রকাশিত এএফপির এক প্রতিবেদন মতে, গত বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) সকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে ১৫৩ জন ফিলিস্তিনিকে বহনকারী একটি চার্টার্ড বিমান জোহানেসবার্গের কাছে একটি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানের যাত্রীদের অনেকেরই ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তাদেরকে বিমান থেকে নামার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় দেশটির বর্ডার পুলিশ।
স্থানীয় একটি দাতব্য সংস্থা থাকার জায়গা দিতে রাজি হওয়ার পর প্রায় ১২ ঘণ্টা বিমানে আটকে থাকার পর সন্ধ্যায় দক্ষিণ আফ্রিকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওই যাত্রীদের নামার অনুমতি দেয়া হয়। এরপর তাদের স্থানীয় একটা দাতব্য সংস্থার জিম্মায় দেয়া হয়।
বর্ডার পুলিশ জানায়, বিমানটি বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টার পর ও.আর. টাম্বো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তবে এসব যাত্রীর পাসপোর্টে ‘প্রচলিত বহির্গমন সিল না থাকায়’ তাদের বিমান ত্যাগের অনুমতি দেয়া হয়নি।’
পুলিশ আরও জানায়, তারা কেউ আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেনি। অবশেষে ‘গিফট অব দ্য গিভার্স’ নামের একটি এনজিও ওই ফিলিস্তিনি যাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়। এরপর দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের নামার অনুমতি দেয়।
পুলিশ আরও জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকার গ্লোবাল এয়ারওয়েজের চার্টার ফ্লাইটটি কেনিয়া থেকে ছেড়ে এসেছিল। তবে ফিলিস্তিনিরা কিভাবে ওই বিমানে দেশ ছাড়ল এবং বিমানটি আসলে কোথা থেকে এসেছে, তা ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
‘গিফট অফ দ্য গিভার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা ইমতিয়াজ সুলেমান দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এসএবিসিকে বলেন, বিমানটি কে ভাড়া করেছিল তা জানা যায়নি। তিনি আরও জানান, এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ১৭৬ জন ফিলিস্তিনি নিয়ে একটি প্লেন জোহানেসবার্গে অবতরণ করে, যার মধ্যে কিছু যাত্রী পরে অন্য দেশে চলে যান।
তিনি বলেন, প্রথম দফায় আসা পরিবারগুলো আমাদের জানায়, তাদের কিছু স্বজন দ্বিতীয় বিমানটিতে এসেছেন। তবে এই বিমানের ব্যাপারে কেউই বিস্তারিত জানতো না। সুলেমান আরও বলেন, মানুষ কিভাবে কোন সিল ছাড়া চাটার্ড বিমানে করে আসছে তা সরকারকে তদন্ত করে দেখতে হবে। ইসরাইল পাসপোর্টে সিল না দেয়ায় তাদের একরকম অবৈধ ভ্রমণ করতে হচ্ছে।
সাব-সাহারা আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি ইহুদি বাস করলেও দেশটি বরাবরই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। এমনকি গাজায় গণহত্যার অভিযোগ এনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলাও দায়ের করে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার।

চাঞ্চল্যকার এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট ফিলিস্তিনির এই আগমনকে ‘রহস্যময়’ অভিহিত করে ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেন। শুক্রবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘গাজার মানুষদের নাইরোবি হয়ে একটি বিমানে করে রহস্যজনকভাবে এখানে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে তাদের এখানে আসার ব্যাপারটি বিস্তৃত তদন্ত করা হবে।
তার কথায়, ‘আমাদের অবশ্যই [ফিলিস্তিনিদের যাত্রার] উৎস, কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, কেন তাদের এখানে আনা হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে হবে।’
গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের পাচারের নেপথ্যে কারা ?
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। এরপর আস্তে আস্তে এর পেছনের কে বা কারা রয়েছে তা সামনে আসতে শুরু করে। ঘটনার তিনদিন পর গত রোববার (১৬ নভেম্বর) ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ জানায়, একজন ইসরাইলি পরিচালিত একটি সংস্থা দক্ষিণ ইসরাইলের র্যামন বিমানবন্দর দিয়ে গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিদেশে পাচারে গোপন ফ্লাইট সমন্বয় করছে।
হারেৎজের মতে, ফিলিস্তিনের এই পাচারের নেপথ্যে রয়েছে ইসরাইলি-এস্তোনিয়ান দ্বৈত নাগরিকত্বধারী তোমার জানার লিন্ড পরিচালিত একটি সংগঠন। সংগঠনটি গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হতে ইচ্ছুক ফিলিস্তিনিদের চার্টার্ড বিমানে করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দূরবর্তী দেশগুলোতে পাচার করছে।
বিনিময়ে মাথাপিছু মোটা অঙ্কের অর্থও (প্রায় ২০০০ ডলার) আদায় করে নিচ্ছে ‘আল মাজদ ইউরোপ’ নামে সংগঠনটি। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মূলত গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানো হচ্ছে, এর মাধ্যমে ইসরাইল সেটাই এগিয়ে নিচ্ছে।
সংগঠনটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটি জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত এবং পূর্ব জেরুজালেমে অফিস পরিচালনা করে। তবে হারেৎজের তদন্তে উঠে এসেছে, এটি আসলে এস্তোনিয়াতে নিবন্ধিত এবং একটি কনসাল্টিং কোম্পানি বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
হারেৎজ আরও জানিয়েছে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ভলান্টারি এমিগ্রেশন ব্যুরো সিওজিএটি নামে একটি সামরিক সংস্থার মাধ্যমে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের পাচারে সংগঠনটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তোমার লিন্ড চার্টার্ড বিমান পরিচালনার দায় অস্বীকার করেননি তবে এই বিষয়ে আরও তথ্য প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
হারেৎজের প্রতিবেদন মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তোমার লিন্ড পরিচালিত সংগঠনটি ইসরাইলের র্যামন বিমানবন্দর থেকে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে, যে ফ্লাইটগুলোতে গাজার ফিলিস্তিনিদের বহন করা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, ফ্লাইটগুলোর মধ্যে একটি ছিল রোমানিয়ার একটি চার্টার্ড বিমান যা ৫৭ জন ফিলিস্তিনিকে গাজা থেকে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে নিয়ে গিয়েছে এবং তারপর ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় একই ধরনের ফ্লাইট গেছে।
এদিকে আরেক ইসরাইলি গণমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথ পত্রিকা জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৫৩ জন ফিলিস্তিনিকে গাজা উপত্যকা থেকে বের করে আনার পেছনেও জেরুজালেমে অবস্থিত ‘আল-মাজদ’ জড়িত।
দৈনিকটি আরও জানিয়েছে, ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ‘সহায়তার’ অজুহাতে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের কাজ করে এবং ‘সংঘাতপূর্ণ এলাকায় মুসলিম সম্প্রদায়কে সাহায্য করার’ দাবি করে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে যোগাযোগের জন্য যেসব তথ্য দিয়ে রাখা হয়েছে তা ঠিক নেই বলে মনে হচ্ছে এবং ফোন নম্বরগুলোও অকার্যকর।
নাম প্রকাশ না করা একজন ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, গাজার অভ্যন্তরে একটি সমাবেশস্থল থেকে কড়া পাহার মাধ্যমে একাধিক বাসে করে ফিলিস্তিনিদের ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত কেরেম শালোম ক্রসিংয়ে নিয়ে আসে ইসরাইল। সেখান থেকে অন্য বাসে করে তাদের নেগেভের র্যামন বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ফ্লাইট ঘিরে যে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল, তা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, এটি গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার জন্য ইসরাইলি প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
ইসরাইলি সামরিক সংস্থা সিওজিএটি প্রধান ঘাসান আলিয়ানের উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিকটি জানিয়েছে, ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের গ্রহণে ইচ্ছুক তৃতীয় দেশ থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে বের করে আনে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরাইল। এই আগ্রাসনে উপত্যকার ৬৯ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭০ হাজার ৭০০-এরও বেশি আহত হয়েছেন। ইসরাইল শুরু থেকেই প্রকাশ্যেই গাজাবাসীকে তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করার কথা বলে আসছে।
শুধু তাই নয়, দক্ষিণ সুদানসহ বেশ কয়েকটি দেশের সাথে ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রশাসন। ইয়েদিওথ আহরোনোথের মতে, ইসরাইলি গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি গাজা ছেড়ে চলে গেছে।
“তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও ডেইলি সাবাহ”

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫ । ২:৩১ অপরাহ্ণ