যেকোনো সময় ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ঢাকা

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫ । ১১:৫১ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে শুক্রবার (২১ নভেম্বর) ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে সারা দেশে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কত মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে- তা নিয়ে কথা বলেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রব। তিনি বলেন, এখন আমরা যেকোনো সময় ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্মুখীন হতে পারি।

ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকায় তিন, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে দুই, নরসিংদীতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় সারা দেশে সাড়ে চারশর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলেও জানা গেছে।

আজ (শুক্রবার) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে এ ভূমিকম্প হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী।

আব্দুর রব বলেন, আজকে একটা প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হতে বেঁচে গেছি আমরা, আলহামদুলিল্লাহ। বাংলাদেশ যে ভূতাত্ত্বিকগত টেকটনিক প্লেটে উপরে রয়েছে সেখানে ৭ বা ৮ রিখটার স্কিলের ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক। কারণ অতীতে এই মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে।

তিনি বলেন, ১৮৯৭ সালে আসাম ও মেঘালয়ে যে ভূমিকম্প হয়েছিল তখন বাংলাদেশ কেঁপে উঠেছিল ৮ দশমিক ৭ মাত্রার রিখটার স্কেলে। কাছারের (সিলেট অঞ্চলের উত্তরে অবস্থিত জৈন্তিয়া পাহাড়) ভূমিকম্প ৮ মাত্রার ছিল। আরাকানে যে ভূমিকম্প ছিল সেটাও ছিল ৮ দশমিক ৫ মাত্রার।

‘সুতরাং বাংলাদেশে এখন রেকারিং পিরিয়ড (নিয়মিত সময় চক্র) অনুযায়ী শতবর্ষ পেরিয়ে গেছে, সোয়াশ বছর হয়ে গেছে লাস্ট রিখটার স্কেল থেকে’ উল্লেখ করে আব্দুর বর আরও বলেন, তাই আমরা এখন যেকোনো সময় ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের সম্মুখীন হতে পারি। সুতরাং আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকা বাঞ্ছনীয়।

বড় ভূমিকম্পের আগাম বার্তা:

এদিকে বড় ভূমিকম্পের আগাম বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির। শুক্রবার দুপুরে তিনি এ বার্তা দেন।

তিনি বলেন, ঢাকা এবং এর আশপাশে বিগত কয়েক দশকে সংঘটিত হওয়া ভূমিকম্পের মধ্যে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প। এ সময় দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ৪ থেকে ৫ মাত্রার সামান্য বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তবে এগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের বাইরে।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে একাধিক বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে; যা প্রমাণ করে যে, এটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। যেকোনো সময় বাংলাদেশে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। ঠিক কবে হবে সেটা আমরা বলতে পারি না।

ভূমিকম্পে মহড়ার বিকল্প নেই:

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ হুমায়ুন আখতার বলেন, এর আগে ২০০৩ সালে রাঙ্গামাটিতে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি বরকল ইউনিয়নে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এটিও অনেক শক্তিশালী ছিল। তবে ১৯১৮ সালে দেশের অভ্যন্তরে সর্বোচ্চ ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

তিনি বলেন, আমরা সরকারকে বারবার বলে আসছি ভূমিকম্পে মহড়ার বিকল্প নাই। সরকার ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারকাজের জন্য কোটি কোটি টাকার বাজেট রাখে, সেখান থেকে দুর্নীতি করতে পারে; কিন্ত যথাযথ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

দেশে প্রায় এক শতাব্দীতে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প হয়নি। কিন্তু ভূমিকম্পপ্রবণ এ অঞ্চলের অতীত ইতিহাস বলছে, বড় দুর্যোগের পূর্বে ছোট ছোট কম্পন হয়ে থাকে। তাই শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে অনুভূত ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পকে ‘ফোরশক’ বা বড় ভূমিকম্পের আগাম সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ১০০ থেকে ১২৫ বছর পরপর এবং ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পরপর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ১৯৩০ সালের পর বড় ভূমিকম্প না হওয়ায় ঝুঁকি বেড়েছে।’

তিনি জানান, এ অঞ্চলে অতীতে ১৮৬৯ সালের ৭.৬ মাত্রার কাছাড়, ১৮৮৫ সালের ৭.১ মাত্রার বেঙ্গল, ১৮৯৭ সালের ৮.১ মাত্রার ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান’ এবং ১৯১৮ সালের ৭.৬ মাত্রার শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ কম্পন হয়েছে।

আজকের ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ঢাকার খুব কাছে, নরসিংদীতে। স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ২০ সেকেন্ড। এতে ঢাকার বিভিন্ন ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞের দাবি, বিল্ডিং কোড না মানায় ভবনগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।

অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘ঢাকা শহরে প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে। রানা প্লাজা ধসের পর আমরা বারবার ভবনগুলো পরীক্ষা করার কথা বলেছি। জরুরি ভিত্তিতে এসব ভবন পরীক্ষা করে ঝুঁকিমুক্ত (সবুজ), সংস্কারযোগ্য (হলুদ) এবং ঝুঁকিপূর্ণ (লাল) হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত।’

আশঙ্কার বিষয় হিসেবে তিনি আরও জানান, ‘ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এক থেকে তিন লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে এবং প্রায় ৩৫ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে।’

ইমেইল ঃ infobdnews999@gmail.com

প্রিন্ট করুন