মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে সৃষ্টি হয়েছে জ্বালানির সরবরাহ সংকট। এই আতঙ্কের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর পেট্রোল পাম্প ও গ্যাস ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। সরবরাহ সংকট দেখিয়ে বন্ধ রাখা রয়েছে বেশ কিছু ফিলিং স্টেশন। যেগুলো খোলা আছে সেখান থেকেও মিলছে না চাহিদা অনুযায়ী পরিবহন জ্বালানি। যা নিয়ে তিব্র ক্ষোভ ঝাড়ছেন জ্বালানি ব্যবহারকারীরা।
শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের উপচে পড়া ভিড়। স্টেশনের সামনে জ্বালানি নেওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারির কারণে, কোনো কোনো সড়কে সৃষ্টি হয়েছে তিব্র যানজট।
চাহিদামতো তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকরা। অধিকাংশ পাম্পে মোটরসাইকেলের জন্য ৫০০ টাকার বেশি তেল মিলছে না, কোথাও বা সর্বোচ্চ ৩০০ টাকার বেশি জ্বালানি দিচ্ছে না।
মূলত দিন যতই গড়াচ্ছে, বাংলাদেশের উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে দেশের জ্বালানি খাত কোথায় যাবে, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও অনেকেই অতিরিক্ত তেল কিনছেন। পাশাপাশি জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। যুদ্ধকালীন আমদানি নির্ভর এই খাতকে স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন ভোক্তারা।
মধ্যপ্রাচ্য পুরোপুরি বিপর্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলায় সংকট ক্রমেই বাড়ছে। এর প্রভাব হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে পড়েছে।
এতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় শঙ্কায় বাংলাদেশ। রাজধানীসহ দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে বেড়ে গেছে ভিড়। ফুরিয়ে যেতে পারে মজুত; এই শঙ্কায় অনেকেই তড়িঘড়ি করে ছুটছেন এসব পাম্পে। আজ শুক্রবার (৬ মার্চ) এই দূরাবস্থা ছিলো আরও বেগতিক। ক্রেতারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে হয়তো চাপ বেড়ে গেছে পাম্পে। সবাই আতঙ্কে আছে যে তেল শেষ হতে পারে বা দাম বাড়তে পারে। তাই সবাই ট্যাংক ফুল করে রাখছেন গাড়ির।
ফুয়েল স্টেশনের কর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিকের তুলনায় জ্বালানি তেলের চাহিদা অন্তত তিনগুণ বেড়ে গেছে। অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করছেন। বিক্রেতারা বলছেন, লোকজন মনে করছে দেশের তেল দ্রুত শেষ হয়ে যাবে, তাই তাড়াহুড়া করছে। ফলে পাম্পে চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে এবং সবাই যতটা প্রয়োজন; তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে তেল নিচ্ছেন।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলেও সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখতে জ্বালানি ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই অবৈধ মজুতদারি ঠেকানোর উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। একটি ফিলিং স্টেশনের পরিচালক বলেন, সরবরাহ এখনো চলছে স্বাভাবিকভাবেই। তবে যেসব পাম্পের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাংকি আছে, তারা অনেক সময় তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারে। সরকারের উচিত বিষয়টি নজরে রাখা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুত আছে, যা মার্চ পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে সক্ষম। যদিও, খুব একটা অভয় দিতে পারছে না জ্বালানি মন্ত্রী। তার মতে, জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া ছাড়া আপাতত সমাধান নেই।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গণমাধ্যমে বলেন, সারা পৃথিবীতে জ্বালানির একটা সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের যা পরিমাণ তেল আছে, তা কীভাবে সাশ্রয় করে ব্যবহার করা যায়, সেটি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা চেষ্টা করছি, যা আছে তা যতটা সম্ভব সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করতে। যুদ্ধ যতদিন চলবে, এই সংকট থাকবে। তারপরও আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে তেল সরবরাহ বাড়ানোর জন্য কাজ করছি।
মাননীয় মন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা যা আছে তা সাশ্রয় করে চালানোর চেষ্টা করছি। যুদ্ধ যতদিন চলবে, এই সংকট থাকবে। তবে আমরা বিভিন্ন সোর্স ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাই।

মোঃ হাসানুজ্জামান, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬ । ৫:০৭ অপরাহ্ণ