শীঘ্রই আসছে নতুন কমিটি, বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর শীর্ষ পদে আগ্রহীদের দৌড়ঝাঁপ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬ । ৮:১২ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদোত্তীর্ণ। কোনো কোনো কমিটিতে মেয়াদ শেষ হয়েছে ১০ বছরেরও বেশি সময়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৩ বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। সঙ্গত কারণেই কিছু অঙ্গ সংগঠনের কমিটির মেয়াদ ১০ বছর অতিক্রম করেছে। আবার কোনো কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি, চলছে সুপার ফাইভ দিয়ে। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যেও বাড়ছে হতাশা।

বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন নিয়েও আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঈদুল ফিতরের পরপরই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। ইতোমধ্যে বিএনপি কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে এ বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন দলটির হাইকমান্ড।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার নির্দেশনা দেন। সূত্র বলছে, ঈদের পর এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করার কথা বলেছেন তিনি।

জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতীদল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দল- এই ৯টি হলো বিএনপির অঙ্গসংগঠন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও শ্রমিক দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন। তবে এসব সংগঠনের অধিকাংশেরই পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র নেই। প্রায় ৪৭ বছরেও ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র তৈরি হয়নি। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোই দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে অনেক যোগ্য নেতৃত্ব যায়গা পাচ্ছে না, তৈরি হচ্ছে মনমালিন্য।

★যুবদল:
বিএনপির প্রধান যুব অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরমধ্যে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ভোলা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সঙ্গত কারণেই তিনি দলীয় পদে থাকতে পারবেন না।

★স্বেচ্ছাসেবক দল:
এদিকে স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষক দল, মহিলা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, তাঁতীদল, জাসাস, শ্রমিক দল ও মৎস্যজীবী দলের কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান-দুজনই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাজীব আহসান বর্তমানে সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

★কৃষক দল:
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে কৃষক দলের কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। শহিদুল ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ-সদস্য।

★ছাত্রদল:
২০২৪ সালের মার্চে রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। সাম্প্রতিককালে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোয় সংগঠনের ভরাডুবি স্পষ্ট। ফলে সংগঠনটিকে পুনর্গঠনের দাবি উঠেছে অনেক আগেই।

★মহিলা দল:
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে মহিলা দলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৩ বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও ১০ বছর একই কমিটি দিয়ে চলছে।

★মুক্তিযোদ্ধা দল:
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা দলের কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত সভাপতি ও সাদেক খান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তিন বছর পরপর সংগঠনটির নতুন কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও এক যুগের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়েও নতুন কমিটি না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে এবং পরস্পরের দূরত্ব বেড়েছে।

★শ্রমিক দল:
২০১৪ সালের এপ্রিলে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে আনোয়ার হোসাইন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিমের নেতৃত্বে সংগঠনটির কমিটি গঠিত হয়। ২০১৬ সালে কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে আর কোনো কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি।

★মৎস্যজীবী দল:
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা আব্দুর রহিমকে সদস্য সচিব করে মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে মারা যান রফিকুল ইসলাম। পরে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির কমিটি বিলুপ্ত করে বিএনপি। এরপর আর কোনো কমিটি হয়নি।

আবদুর রহিম একটি শীর্ষ গণমাধ্যমে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসাবে মৎস্যজীবী দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে অকুতোভয় ভূমিকা রেখেছে। ২ জন নিহত হওয়া ছাড়াও এই সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মী আহত এবং হামলা, মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। স্বৈরাচার পতনের পর প্রায় দেড় বছর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি না থাকা সত্ত্বেও মৎস্যজীবী দল অবিচ্ছিন্নভাবে বিএনপি ঘোষিত সব কর্মসূচিতে সফলভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। এ পর্যায়ে মৎস্যজীবী দলের সারা দেশের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও বেগবান করতে এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠন সময়ের দাবি।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক ও মো. মজিবুর রহমানকে সদস্য সচিব করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হয়।

★জাসাস:
এদিকে বিভিন্ন দিবস উদযাপনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) কার্যক্রম। ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ড. মামুন আহমেদ ও হেলাল খানের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর হেলাল খানকে আহ্বায়ক ও জাকির হোসেন রোকনকে সদস্য সচিব করে ২০২১ সালের নভেম্বরে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটির মেয়াদ তিন বছর হলেও ওই কমিটি প্রায় ৫ বছর পার করছে।

সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদে যেতে আগ্রহীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। পদপ্রত্যাশীরা ইতোমধ্যে যার যার মতো করে লবিং শুরু করেছেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। অনেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথাও তুলে ধরছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালাচ্ছেন তারা।

তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতে, নির্ধারিত সময়ে নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় একদিকে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়ায় অনেক পদবঞ্চিত কর্মী সংগঠন থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। একই কমিটি দীর্ঘদিন থাকার ফলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও বাড়ছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠন করা গেলে দল সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হবে এবং নির্বাচনে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। তবে আসন্ন কমিটি গুলোতে ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করলে সামনের রাজনীতি আরও কষ্টের হবে বলে মত সকলের।

ইমেইল ঃ infobdnews999@gmail.com

প্রিন্ট করুন