মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবে যুক্তরাজ্যজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামাল দিতে না পেরে ব্রিটেনের বিভিন্ন প্রান্তে বিপুল সংখ্যক পেট্রোল পাম্প সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে রাজধানী লন্ডনসহ সারা দেশে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২ পাউন্ডের রেকর্ড স্পর্শ করার উপক্রম হয়েছে, যা সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নাভিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। অনেক পাম্পের প্রবেশপথে ‘তেল নেই’ কিংবা ‘বিক্রি বন্ধ’ লেখা নোটিশ ঝুলতে দেখা যাচ্ছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে এক নজিরবিহীন দৃশ্য।
বর্তমান এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ও স্বতন্ত্র জ্বালানি বিক্রেতারা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম লভ্যাংশে তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও পাইকারি বাজারে তেলের দাম যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, খুচরা বাজারে সেই অনুযায়ী দাম সমন্বয় করা সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লোকসান এড়াতে যখনই তাঁরা সামান্য মূল্য বৃদ্ধি করছেন, তখনই সাধারণ গ্রাহকদের তীব্র অসন্তোষ ও সামাজিক ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই ত্রিমুখী চাপের মুখে পড়ে অনেক মালিক লোকসান ঠেকাতে তাঁদের পাম্পগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা মূলত ব্রিটিশ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি স্থবিরতা তৈরি করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বাজারমূল্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিযোগিতা ও বাজার কর্তৃপক্ষ (সিএমএ) নজরদারি কঠোর করেছে। গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে তেল পাওয়ার সুবিধা দিতে সরকার সম্প্রতি ‘ফুয়েল ফাইন্ডার’ নামক একটি বিশেষ ডিজিটাল স্কিম চালু করেছে, যার মাধ্যমে গ্রাহকরা রিয়েল-টাইম মূল্য জানতে পারছেন।
যদিও এই পদক্ষেপটি সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু বড় বড় চেইন শপগুলোর তুলনায় ছোট ও স্বাধীন পাম্পগুলোর ওপর এটি বাড়তি প্রতিযোগিতার চাপ তৈরি করেছে। ফলে অনেক ছোট পাম্প মালিক বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা করছেন।
এরই মধ্যে নতুন করে সংকট তৈরি করেছে সরকারের ৫ পেন্স জ্বালানি শুল্ক ছাড় বাতিলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। এর আগে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকার যে বিশেষ শুল্ক ছাড় দিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় তেলের প্রকৃত খুচরা মূল্য এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা দ্রুত প্রশমিত না হলে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে যুক্তরাজ্যের জ্বালানি বাজারের এই অচলাবস্থা সহজে কাটবে না। সব মিলিয়ে তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং পাম্প বন্ধের এই হিড়িক ব্রিটিশ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন সরকারের পক্ষ থেকে আরও শক্তিশালী কোনো পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬ । ২:২৯ অপরাহ্ণ