প্রশাসকরাই হচ্ছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী

মোঃ হাসানুজ্জামান, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ । ৪:৫৩ অপরাহ্ণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর নিয়োগপ্রাপ্ত দলীয় প্রশাসকদেরকেই আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী করতে পারেন বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে অর্পন করা হয়েছে মাঠ গোছানোর দায়িত্ব।

সম্প্রতি ঢাকার দুই সিটিসহ ১১ সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। বড় কোনো ব্যত্যয় না হলে কিংবা দুর্নীত-বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে না পড়লে এসব প্রশাসকরাই হতে পারেন দলের মেয়র প্রার্থী। বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। জানা গেছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইউনিয়ন পরিষদের মধ্য দিয়ে শুরু হতে পারে এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া।

এরআগে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় নাকি নির্দলীয়ভাবে হবে, জাতীয় সংসদে ফয়সালা হবে সেই সিদ্ধান্তের। তবে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় এক থেকে দেড় বছরের আগে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই, এমনটাই জানিয়েছেন সরকারের একাধিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচনী প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দৃশ্যমান করতে চায় সরকার।

দীর্ঘ দুই দশকের খরা কাটিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা নেওয়ার পর জনগণকে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন বিএনপি সরকারের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাই আপাতত স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সেভাবে দৃষ্টি নেই তাদের। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচনী প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দৃশ্যমান করতে চায় সরকার। তারপর তৃণমূলে সংগঠন মজবুত করেই স্থানীয় সরকার ভোটে নজর দিতে চায় বিএনপি।

জাতীয় নির্বাচনে দলটির স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে অনেক জায়গায় তৃণমূল কার্যত রয়েছে বিভক্ত অবস্থায়। সংগঠন গোছানোর কার্যক্রম ঈদুল আজহার পর শুরু করতে পারে বিএনপি। ইতোমধ্যে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাথে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দলটির নেতারা জানিয়েছেন, সরকার যখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রূপরেখার দিকে এগোবে, বিএনপিও তখন সুসংগঠিত ও শক্তিশালী সংগঠন নিয়ে মনোযোগ দেবে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ১৯ আগস্ট দেশের ১২ সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে বসানো হয় প্রশাসক। বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় ১১ সিটিতে।

তবে দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় তৈরি হয় সমালোচনা। তখন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে রাজনৈতিক নেতারা ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন বলেই তাদের দেওয়া হয়েছে নিয়োগ। তাছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততাও থাকে জনগণের।

প্রথমে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ ৬ সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আব্দুস সালাম। এক সময় তিনি ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক। এছাড়া বিএনপির বর্ষীয়ান এই নেতা দায়িত্ব পালন করেছেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র হিসেবেও। গত নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন তিনি।

আসন্ন সিটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘মেয়র নির্বাচন করার জন্যই তো এসেছি এখানে (প্রশাসক)। অতীতে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তা ছাড়া আমি দীর্ঘদিন রাজধানী ঢাকার রাজনীতিতে যুক্ত। আশা করছি, নাগরিক সেবা নিশ্চিতে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে কাজ করতে পারব।’

‘তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে দলের চেয়ারম্যানের ওপর, তিনি মনোনয়ন দিলে করব নির্বাচন। এখন স্বাভাবিকভাবেই কাজ-কর্ম করছি, যাতে জনগণ বুঝতে পারে যে— আমাকে দায়িত্ব দিলে তাদের জন্য করতে পারব কাজ-কর্ম। এটা পরীক্ষার আগে পরীক্ষা হয়ে যাবে।’

দক্ষিণ সিটির এ প্রশাসক উল্লেখ করেন, ‘বর্তমান সরকারের যে সমস্ত কমিটমেন্ট-দায়িত্ব আছে, সেগুলো তো সরকারকে পালন করতেই হবে। আমাদের দলীয় সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। জনগণের প্রতি আমাদের যে কমিটমেন্ট-ডেডিকেশন থাকবে, অন্য কারো তো সেটি থাকবে না। সেটি আমরা প্রমাণ করার চেষ্টা করছি এবং ইতোমধ্যে অনেকাংশে করেছিও। আমি বিশ্বাস করি, পুরোপুরি না হলেও জনগণও পেতে শুরু করেছে নাগরিক সুবিধা। জনগণের যেসব চাওয়া-পাওয়া, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চেষ্টা করব আমরা সেগুলো ফুলফিল করার।’

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক। এর আগে তিনি ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মিল্টন। তবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা.শফিকুর রহমানের কাছে হেরে যান তিনি।

সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেছেন, ‘সরকার আমাকে কাজ করতে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক করে পাঠিয়েছে। আমি কাজ করছি নাগরিক সেবা নিশ্চিতে। আগামীতে দল যদি আমাকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেয়, সেক্ষেত্রে নির্বাচন করব আমি। আর দল যদি অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়, তার পক্ষেই করব কাজ। দলই এ ব্যাপারে নেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আমি মনোনয়ন চাইতে পারি, বলতে পারি— কিন্তু দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’

প্রশাসক আব্দুস সালাম ও শফিকুল ইসলাম মিল্টনের পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী হতে চান বিএনপির আরও অনেকে। তারা অপেক্ষায় রয়েছেন দলের গ্রিন সিগন্যালের। তবে বর্তমান সিটি করপোরেশন প্রশাসকদের পাল্লা কিছুটা ভারি, এ-কথা বলাই যায়।

★ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আরও যারা আলোচনায়:

দক্ষিণে মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আরও আলোচনায় আছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন, সাবেক ডেপুটি মেয়র কাজী আবুল বাশার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস।

বিএনপির ত্যাগী নেতাদের একজন সোহেল। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বাংলাদেশে রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক মামলা ৪৫০টি করা হয় তার বিরুদ্ধে। সোহেল বলেছেন, ‘দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই করবেন নির্বাচন।’

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হন ইশরাক। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে দক্ষিণ সিটি থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচন করেন বিএনপির এই নেতা।

★ঢাকা উত্তর সিটিতে আলোচনায় যারা:

ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএ কাইয়ূম, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সদস্য সচিব মোস্তফা জামান, যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তর) এবিএমএ রাজ্জাক, আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক এম কফিল উদ্দিন আহমেদ।

তাবিথ আউয়াল ২০২০ সালের উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের মেয়র প্রার্থী ছিলেন। এমএ কাইয়ূম ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে ছিলেন বিএনপির প্রার্থী। মোস্তফা জামান ও কফিল উদ্দিন আহমেদ বিগত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে ছিলেন বিএনপির অন্যতম মনোনয়নপ্রত্যাশী।

দল মনোনয়ন দিলে আসন্ন মেয়র নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটি থেকে ভোট করতে চান জামান। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দল যদি ঢাকা মহানগর উত্তরকে সাজাতে চায় এবং আমার মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে চায়; আর এ কাজে দল যদি আমাকে উপযুক্ত ও যোগ্য মনে করে, তাহলে আমি নির্বাচন করব মেয়র পদে।’

★খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয় মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে। খুলনা-২ আসনের এই সাবেক সংসদ সদস্য এবার একই আসন থেকে নির্বাচন করে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান।

★সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। এবারের নির্বাচনে তিনি সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে সিলেট জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বিএনপির নির্বাচন সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

★নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মো. সাখাওয়াত হোসেন খান। ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে মেয়র পদে নির্বাচন করে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। এবারের সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দলের মনোননয়ন চেয়েও পাননি।

★গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মো. শওকত হোসেন সরকারকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে বসানো হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি গাজীপুর-২ আসনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

★৬ সিটির ধারাবাহিকতায় গত ১৪ মার্চ বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও কুমিল্লাতেও বিএনপি নেতাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেয় সরকার। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হন বিলকিস জাহান শিরীন। তিনি বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। মাহফুজুর রহমান দায়িত্ব পান রাজশাহী সিটির। তিনি মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলে আসছেন।

★ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রুকুনোজ্জামান রোকন হন সেখানকার নগর সংস্থার প্রশাসক। রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হন মাহফুজ উন নবী চৌধুরী; যিনি রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব। কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা হন সেখানকার সিটি করপোরেশনের প্রশাসক।

ইমেইল ঃ infobdnews999@gmail.com

প্রিন্ট করুন