সিরাজগঞ্জে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে সনদ, ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক
০৭ নভেম্বর ২০২৬ ৭:১৫ পিএম
সিরাজগঞ্জে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে সনদ, ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নে জমির উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের জেরে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে মৃত্যু সনদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে অন্য একজনের নামে একদিনেই ওয়ারিশ সনদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মাসুদুর রহমান মাসুদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জমির মালিকানা, মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশ সনদের সত্যতা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, খামার পাইকশা গ্রামের খাদেম আলী মন্ডলের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে এ বিরোধের সূত্রপাত। তাঁর নামে ইস্যু করা একটি মৃত্যু সনদে মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১ মে ১৯৮৪। অথচ ১৭ জানুয়ারি ১৯৯১ সালের একটি জমির দলিলে তাঁর টিপসই থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ মৃত্যু সনদ অনুযায়ী মৃত্যুর প্রায় সাত বছর পরও জমির দলিলে তাঁর টিপসই রয়েছে। এ ছাড়া ২ মার্চ ১৯৯৩ তারিখে একই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাঁর প্রকৃত মৃত্যু সনদ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব নথি ঘিরে সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, খাদেম আলীকে নিজের বাবা দাবি করে জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতার নাম পরিবর্তন করেন রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা ইউনিয়নের ঝাপরি গ্রামের রহমত আলী মন্ডল। পরে তাঁর ছেলে জহুরুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে বিতর্কিত ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করেন। ওই সনদের ভিত্তিতে জমি নামজারি করে বিক্রির চেষ্টাও করা হয়। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাদেম আলীর ভাতিজা আব্দুল হালিম।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খাদেম আলী মন্ডল ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁর মৃত্যুর পর একমাত্র জীবিত ভাই আবেদ আলী মন্ডল উত্তরাধিকারী হন। পরবর্তী সময়ে আবেদ আলীর ছেলে আব্দুল হালিম ও মেয়ে আমিনা বেগম ওই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন।

আব্দুল হালিমের অভিযোগ, রহমত আলী প্রায় এক যুগ আগে জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর পিতার নাম পরিবর্তন করে খাদেম আলী মন্ডল উল্লেখ করেন। এরপর চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর খাদেম আলীর ছেলে পরিচয়ে শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করেন। ওই সনদের ভিত্তিতে কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের লাহেড়ী বাড়ী মৌজাসহ বিভিন্ন স্থানে খাদেম আলীর সম্পত্তি নিজের নামে নামজারি করে বিক্রির চেষ্টা করা হয়।

মৃত্যু সনদ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ১৯৮৪ সালে খাদেম আলীর মৃত্যু হয়ে থাকলে ১৯৯১ সালের দলিলে তাঁর টিপসই কীভাবে পাওয়া গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁরা সম্পত্তি নিয়ে নানা জটিলতা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতার নাম সংশোধন এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে আদালতে মামলা হলে অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেওয়া হয়। পিবিআইয়ের তদন্তে আব্দুল হালিমের দাখিল করা খাদেম আলীর মৃত্যু ও ওয়ারিশ-সংক্রান্ত কাগজপত্রের সত্যতা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, জহুরুল ইসলামের পক্ষ থেকে দাখিল করা মৃত্যু ও ওয়ারিশ-সংক্রান্ত সনদে অসংগতি পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সর্বশেষ কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল ভূমি অফিসে বিতর্কিত নামজারি বাতিলের আবেদন করেন আব্দুল হালিম। দীর্ঘ শুনানি শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া ওয়ারিশ সনদ পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। গত ৪ নভেম্বর পুনঃতদন্তের শুনানিতে বিতর্কিত ওয়ারিশ সনদে ভুলের বিষয়টি স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। একই সঙ্গে আব্দুল হালিমের সংগ্রহ করা ওয়ারিশ সনদকে প্রকৃত সনদ হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আব্দুল হালিমের আরও অভিযোগ, তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাজমুল হোসেনের দায়িত্ব পালনকালে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বিতর্কিত ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে আলম তথ্য যাচাই করে প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের নামে সনদ দেন।

এ বিষয়ে শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) নাজমুল হুদা বলেন, আদালতের নির্দেশে তথ্য যাচাই-বাছাই করে সঠিক মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছে।

রহমত আলীর ছেলে জহুরুল ইসলাম বলেন, মেম্বারকে বিষয়গুলো জানানোর পর একদিনেই কয়েকজনের স্বাক্ষর নিয়ে তাঁকে ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছিল। এখন কেন সেটি বাতিল হলো, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারছেন না।

বিতর্কিত ওয়ারিশ সনদে স্বাক্ষরকারী ইউপি সদস্য মাসুদুর রহমান মাসুদ হোয়াটসঅ্যাপে বলেন, তিনি কোনো ভুল করেননি। ভোটার আইডি কার্ড ও জন্মনিবন্ধন দেখেই ওয়ারিশ সনদ দিয়েছেন। ভোটার আইডি কার্ডে ৭ নম্বর ওয়ার্ড, খামার পাইকশা উল্লেখ রয়েছে এবং জন্মনিবন্ধন শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ভোটার আইডি কার্ড দেখেই তাঁরা ওয়ারিশ সনদ প্রদান করেন।

শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসক মো. নাজমুল হক বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র, গ্রাম পুলিশ ও ইউপি সদস্যের সুপারিশ এবং জন্মনিবন্ধন যাচাই করে আইন অনুযায়ী ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছিল। তবে পিবিআইয়ের তদন্তে প্রকৃত তথ্য উঠে আসায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

কামারখন্দের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, রেকর্ডীয় মালিক খাদেম আলীর ছেলে রহমত আলীর ওয়ারিশ সনদ ব্যবহার করে জমি নামজারি করা হয়েছিল। ওই সনদে তথ্য গোপনের অভিযোগে নামজারি বাতিলের আবেদন করেন খাদেম আলীর ভাতিজা আব্দুল হালিম। একই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুই পক্ষের নামে ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হওয়ায় দীর্ঘ শুনানি ও যাচাই-বাছাই শেষে ইউনিয়ন পরিষদের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়। পরে পরিষদ থেকে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

এদিকে মৃত্যু সনদে উল্লেখিত তারিখের প্রায় সাত বছর পর দলিলে টিপসই থাকার বিষয়টি কীভাবে সম্ভব হলো, একই ব্যক্তির নামে একাধিক ওয়ারিশ সনদ কীভাবে দেওয়া হলো এবং সনদ প্রদানের আগে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কী ধরনের যাচাই-বাছাই করেছিলেন—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

শেয়ার করুন
Generating Photo Card...
Please wait...