ঢাকাই সিনেমার নন্দিত নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’র প্রতিষ্ঠাতাও। নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করে যাচ্ছেন তিনি।
সড়কের বিভিন্ন সমস্যা ও পরিবহন মালিকদের অরাজকতা নিয়েও বহুবার কথা বলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। এ কারণে বিগত সরকারের আমলে নানা ঝামেলায়ও পড়তে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সঙ্গে একাধিকবার বিবাদে জড়িয়েছিলেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সভায় কথা বলেছেন এই নায়ক। যেখানে ইলিয়াস কাঞ্চন সরাসরি দাবি করেছেন, তিনি কখনোই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে ইদানিং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
ইলিয়াস কাঞ্চনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে নেওয়া তার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ সরকারিভাবে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ পালিত হচ্ছে। কিন্তু একটি মহল বিষয়টি অস্বীকার করছে।
তিনি বলেন, ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন, তারও আগে থেকে ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, তাদের দাবির ভিত্তিতেই নাকি জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এর আগে নাকি নিরাপদ সড়কের জন্য মানুষের কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন করতে গিয়ে আমাকে শাজাহান খান গংদের মতো মাফিয়াচক্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমার ছবি টাঙিয়ে তারা জুতা নিক্ষেপ করেছেন। আমার ছবিতে ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়েছেন।
সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে অনুরাগীদের সঙ্গে নিজের মতামত শেয়ার করছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, সরকারকে নিয়ে যেসব কথাবার্তা শুরু হয়েছে, সেটা ভয়াবহ। আমরা যারা অনেক রিস্ক নিয়ে, অনেক ত্যাগ করে এই আন্দোলনে শরিক হয়েছিলাম, এই সরকার যদি ব্যর্থ হয়, এই আন্দোলন যদি ব্যর্থ হয়, তারা যদি আবার ফেরত আসে, তাহলে আমাদের অবস্থা কী হবে? আমাদের কী পরিণতি হবে, এটা কিন্তু আমরা কেউ ভেবে দেখছি না। এগুলো সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমি এই কথাগুলো লাইভে এসে বলছি।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, একদল মানুষ বলছে আমি নাকি আওয়ামী লীগের লোক। এটা সমন্বয়কদের কাছে তারা বলেছে। এমনটাও বলেছে, আমি নাকি আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছিলাম। তারা বলে- আমি আওয়ামী লীগের লোক, এই দলের লোক, ওমুক পার্টির লোক… দেশবাসী জানে আমি কোনোদিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হইনি। কিন্তু এবার যেভাবে তারা আমাকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই আমি আওয়ামী লীগের কেউ হয়ে থাকলে আমাকে গ্রেপ্তার করুন।
ঢাকাই সিনেমার এই নায়ক আরও বলেন, আপনাদের ক্ষমতা দেখান। তবুও অপপ্রচার চালাবেন না। আমি দেশবাসীর কাছে এই অপপ্রচারের বিচার চাই।
দেশজুড়ে হাম সংক্রমণে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি অনেকটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো হলেও এই সংকটের পেছনে কারা দায়ী, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুধবার (১৩ মে) সকালে সচিবালয়ে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে পোলিও ভ্যাকসিন গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সরকারকে ৩ লাখ ৮০ হাজার ডোজ পোলিও ভ্যাকসিন অনুদান দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ছিল। তবে সরকার অনেকটাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।” তিনি জানান, দেশের বেশির ভাগ জেলায় টিকাদান কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং বাকি শিশুদেরও দ্রুত টিকার আওতায় আনা হবে।
একই অনুষ্ঠানে শিশুদের পুষ্টি সুরক্ষায় নতুন কর্মসূচির কথাও জানান তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষায়, “আগামী জুনের মধ্যে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হবে।”
হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে কারা দায়ী, তা তদন্ত করে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দেশজুড়ে হামের বিস্তার নিয়ে স্বাস্থ্যখাতে উদ্বেগ বাড়ছে। সময়মতো টিকা না পাওয়ায় অনেক শিশু সংক্রমণের শিকার হয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের কান্না আর উৎকণ্ঠা এখন নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় যে রোগে মৃত্যুহার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল, সেই হাম আবার ভয়াবহ আকারে ফিরে আসা বড় সতর্ক সংকেত। বর্তমানে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার দাবি করা হলেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, দেরিতে শনাক্তকরণ এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তাই শুধু জরুরি টিকাদান নয়, দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনাও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
দেশে হাম ও এর উপসর্গে বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের জন্য ‘লজ্জার’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। বুধবার (১৩ মে) দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী বলেন, সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা। তবে লক্ষ্যমাত্রার বাইরেও অনেক শিশু ভ্যাকসিন গ্রহণ করায় বর্তমানে টিকাদানের হার ১০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। সরকারের ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির কারণেই দেশে হাম সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল রয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বলেন, বছরের পর বছর অবহেলার কারণে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অত্যন্ত রুগ্ন অবস্থায় রয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাই স্বাস্থ্য কাঠামোর মূল ভিত্তি এবং জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য বলেও জানান তিনি।
কয়েক দফা পেছানোর পর অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। প্রকল্পের মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একনেক সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় রাখা হয়েছিল পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। এর আগে প্রকল্পটি কয়েক দফা একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলেও অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
একনেক সভায় উপস্থিত থাকা একজন কর্মকর্তা বলেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে, কমবে লবণাক্ততা, প্রাণ ফিরে পাবে মৃতপ্রায় নদীগুলো- একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।
শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করার জন্য এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত কলকাতা বন্দরের নাব্য উন্নত করার জন্য ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে ভারত। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী শুকিয়ে গেছে।
ফারাক্কা ব্যারেজের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে প্রথম পর্যায়ে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। এ প্রকল্পটি সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করতে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। পদ্মা বাঁধ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা।
তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়। ১৯৯৬ সালে হওয়া গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সত্তরের দশকে ভারত পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করার ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে। ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খালগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যা কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন, বনায়ন, নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের উদ্দেশ্য:
বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা ও বরিশাল জেলার বিস্তৃত অঞ্চলের জন্য পদ্মা নদী ভূ-উপরিস্থ সুপেয় পানির একমাত্র উৎস হওয়ায় এ অঞ্চলের উন্নয়ন পদ্মার পানির যথাযথ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। পদ্মা নদীতে প্রবাহিত পানি বর্ষা পরবর্তীসময়ে সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত প্রবাহই এ সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায়। এ প্রেক্ষাপটে পদ্মা নদীতে রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় একটি বাঁধ নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থানে আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য আলোচ্য প্রকল্পের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটি মোট ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সম্পূর্ণ প্রকল্পটি এক ধাপে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সংস্থান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি/সমন্বয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাছাড়া, প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ পরবর্তী সংশ্লিষ্ট নদী সিস্টেম জলাধার থেকে প্রাপ্ত প্রবাহের সঙ্গে হাইড্রোলোজিক্যাল ও মরফোলজিক্যালভাবে ধীরে ধীরে অভিযোজিত হবে। ফলে খননসহ সংশ্লিষ্ট কাজগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার সুযোগ রয়েছে বিধায় প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত হবে।
এ প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে সুপারিশ করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এজন্য প্রথম ধাপে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
পাউবো জানায়, প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যারেজের মূল অবকাঠামো নির্মাণসহ হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী সিস্টেম ও গড়াই-মধুমতি নদী সিস্টেম পুনর্খনন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তবায়নযোগ্য অতিরিক্ত/সহায়ক অবকাঠামো এবং অবশিষ্ট নদী সিস্টেমগুলোর (চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেম) পুনরুদ্ধার কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম পর্যায়ে মূল ব্যারেজ ও গড়াই অফটেক স্ট্রাকচারে দুটি হাইড্রো-পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের সংস্থান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিনা জ্বালানিতে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।
প্রকল্পটির প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নের ফলে সংশ্লিষ্ট নদী সিস্টেম খনন এবং প্রবাহ বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকল্প এলাকার লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ হ্রাসসহ জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার এবং নদী ফলস্বরূপ, এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, বনায়ন, নৌচলাচল, গার্হস্থ্য পানির প্রাপ্যতা এবং ইকো-সিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া স্বাদু পানির প্রবাহ হ্রাসের কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর নদী এবং খালগুলোতে লবণাক্ততার উচ্চ ঘনত্বের কারণে এলাকার জনসাধারণের জীবন ও জীবিকা প্রতিনিয়ত গুরুতর হমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
নদীর সিস্টেম পুনরুজ্জীবিত করা:
নদীর সিস্টেম বলতে বোঝায় একটি প্রধান নদীর সঙ্গে যুক্ত তার শাখা নদী, উপনদী, খাল, বিল, জলাধার ও পানিপ্রবাহের পুরো নেটওয়ার্ক। পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি পাঁচটি নদীর সিস্টেম পুনরুজ্জীবিত করা হবে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলা) লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ হ্রাস; স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ করা হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পলি অপসারণ করে যশোরের ভবদহসহ অন্যান্য এলাকার জলাবদ্ধতা হ্রাস ও পদ্মানির্ভর এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।
পদ্মানির্ভর এলাকার প্রধান ৫ নদী-সিস্টেম পুনরুজ্জীবিতকরণের পাশাপাশি নদী পুনর্খনন ড্রেজিং ও রেগুলেটর দেওয়া হবে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মৃতপ্রায় হিসনা নদী পুনরুদ্ধার করে ‘হিসনা অফটেক’ নির্মাণ করা হবে। এটা ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে। রাজবাড়ীর পাংশায় চন্দনা অফটেক হবে। এটা ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ৬৭ কিলোমিটার দূরে। কুষ্টিয়ায় গড়াই অফটেক নির্মাণ হবে, ভারত সীমান্ত থেকে যেটি প্রায় ৫৭ কিলোমিটার দূরে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া এবং জি-কে সেচ প্রকল্পে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পদ্মার মতো বড় নদীর ক্ষেত্রে পরবর্তীতে হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল অবস্থার পরিবর্তন অস্বাভাবিক নয় বিধায় প্রকল্প বাস্তবায়নকালে এর গতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে নদীগুলোর হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সমীক্ষা হালনাগাদ করার প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে ডিপিপিতে কিছু পরামর্শক সেবার সংস্থান রাখা হয়েছে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম:
রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট (প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার), ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক, দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিস পাস এবং ব্যারাজের ওপর দিয়ে একটি রেলওয়ে সেতু। পাশাপাশি প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
গড়াই অফটেক এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ১৫টি স্পিলওয়ে, ফিস পাস, নেভিগেশন লক, গাইড বাঁধ, অ্যাপ্রোচ এমব্যাঙ্কমেন্ট ইত্যাদি করা হবে। চন্দনা অফটেক অবকাঠামোতে চারটি স্পিলওয়ে নির্মাণ হবে। হিসনা অফটেক অবকাঠামোতে পাঁচটি স্পিলওয়ে হবে।
পদ্মা ব্যারাজ সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিক ওয়ার্কস এবং হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের ফলে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলবে। গড়াই অফটেক সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিক ওয়ার্কস এবং হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণে ৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলবে। গড়াই-মধুমতি নদী ড্রেজিং হবে, ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার খনন হবে। হিসনা নদী সিস্টেমে নিষ্কাশন পুনর্খনন হবে ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার। এফ্ল্যাক্স বাঁধ নির্মাণ হবে ১৮০ কিলোমিটার।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের এলাকা:
পদ্মা ব্যারাজের মোট প্রকল্প এলাকা বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ, যা দেশের চারটি বিভাগের ২৬টি জেলার ১৬৩টি উপজেলায় বিস্তৃত। তবে প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে দেশের চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা উপকৃত হবে।
খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা, ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ, রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। চারটি বিভাগের ১৯টি জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা:
প্রকল্পের আওতায় শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদী ব্যবস্থায় প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা কমবে, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা পাবে এবং প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ধরা হয়েছে ১৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি-মে) হিসনা-মাথাভাঙ্গায় ২৩৯, গড়াই-মধুমতিতে ২৩০, চন্দনা-বারাশিয়ায় ৮০, বড়াল ও ইছামতি নদী সিস্টেমে ২২ এবং গোদাগাড়ি পাম্প হাউজে ২৫, জি-কে প্রকল্পে ৬৪ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩ কিউসেক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের নিট চাষযোগ্য এলাকা প্রায় ২৮ দশমিক ৮০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানির সংস্থান নিশ্চিত করা। এছাড়া, প্রকল্পের মাধ্যমে আনুমানিক ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা।
বাঁধের ডেক/করিডোরকে বহুমুখী অবকাঠামোগত সংযোগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সড়ক সংযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন পাইপলাইন স্থাপন ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। প্রকল্প এলাকায় ধান প্রায় ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং প্রায় ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বার্ষিক আনুমানিক প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন অর্জন হবে।
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন গণমাধ্যমে বলেন, প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি মূলত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিগত সরকারগুলোর সময় বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা তৈরি হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়লে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও কিছু ক্ষেত্রে পুনরুদ্ধার সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, তবে ব্যারাজের উজানে ক্ষয় এবং ভাটিতে পলি জমার মতো মরফোলজিক্যাল ও পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে, যা উন্নত নকশা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন