‘শেখ হাসিনা সরকার সবকিছু ধ্বংস করে গেছে’

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
০৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ৯:২৮ পিএম
‘শেখ হাসিনা সরকার সবকিছু ধ্বংস করে গেছে’

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার সবকিছু ধ্বংস করে গেছে। নির্বাচনের আগে আমাদের অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থায় সর্বাত্মক সংস্কার করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত শনিবার নিক্কেই এশিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। গত সোমবার সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংবিধান এবং বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করেছে। জানুয়ারির মধ্যে ওই কমিশনগুলোর সুপারিশ হাতে পাওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়ন করার কথা জানান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

তবে এই সংস্কার বাস্তবায়নে সময় লাগবে বলে জানান তিনি। উপদেষ্টা বলেন, এই সংস্কার বাস্তবায়নে সময় লাগবে, কেননা ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়তে আমরা একদম শূন্য থেকে শুরু করেছি।

নির্বাচন ঠিক কখন হবে সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের সময় নির্ভর করছে সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর। এর ফলাফলই সময় নির্ধারণ করে দেবে।

সাধারণ নির্বাচনে ড. ইউনূস প্রার্থী হবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বলেন, না, আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি সবসময়ই রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছি। রাষ্ট্রের যেসব ব্যক্তি নীতি-নৈতিকতা সমুন্নত রাখেন, নিয়ম-কানুন মেনে চলেন এবং নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত রাখেন তাদেরই নির্বাচনে দাঁড়ানো উচিত বলে মনে করেন প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের শাসনকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, আর গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করে তা পুনর্গঠনের সুবিশাল কর্মযজ্ঞ আমাদের ঘাড়ে এসে পড়েছে। হাসিনার শাসনামলে গণতন্ত্রের রীতি-নীতি একদম ধ্বংস হয়ে গেছে। টানা তিন মেয়াদে ভোটারবিহীন ভুয়া নির্বাচন মঞ্চস্থ করেছেন হাসিনা। আর তাতে তিনি নিজেকে এবং তার দলকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। একজন ফ্যাসিবাদী শাসক হিসেবে এসব করেছেন হাসিনা।

জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এ বছরের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন সরকারি চাকরিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে কয়েকশ শিক্ষার্থী নিহত হন। এরপরই শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন হাসিনার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তিনি হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে পালিয়ে যান। অক্টোবরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা এবং তার বেশ কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

এই বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় হলে হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে ভারতকে অবহিত করা হবে বলে জানান ড. ইউনূস।

এবিষয়ে তিনি আরও বলেন, বিচার শেষে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় এলে আমরা ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনাকে হস্তান্তরের অনুরোধ জানাব।

এক্ষেত্রে তিনি উভয় দেশের স্বাক্ষরিত একটি আন্তর্জাতিক আইনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারত এ আইন মেনে কাজ করতে বাধ্য হবে।

কূটনৈতিক ফ্রন্টে বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে শক্তিশালী ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত। এক্ষেত্রে ড. ইউনূস দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব করেছেন। ভারত ও পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্কের ফলে সার্ক কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছে। সার্কের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মতো নিজেদের মধ্যে চলাফেরার স্বাধীনতা, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য উৎসাহিত করা। সার্কের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ভারতেকে পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা নিরসনের আহ্বান জানান ড. ইউনূস।

এদিকে হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ভারত। তাদের দাবি বাংলাদেশে হিন্দুদের ঘরবাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও মন্দিরে ‘হামলা’ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকাকে অবশ্যই হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বলে জোর দিয়েছে দিল্লি। তবে ভারত সরকারের এসব ঢালাও বক্তব্য নাকচ করে দেন ড. ইউনূস।

তিনি বলেন, সংখ্যালঘু ইস্যুতে যা বলা হচ্ছে তার বেশির ভাগই প্রোপাগান্ডা। এগুলো সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলা হচ্ছে না বলে পাল্টা অভিযোগ করেন ড. ইউনূস।

তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের বাংলাদেশে এসে তদন্তসাপেক্ষে সঠিক তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা এসব অপ-তথ্যের বিরুদ্ধে ভারত সরকারকে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য কাজ করছি। অন্য আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইউনূস চীনকে ‘আমাদের বন্ধু’ বলে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, সড়ক ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে শুরু করে সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত তারা আমাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশ বেইজিংয়ের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংস্থা- আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার বিষয়ে জোর দেন ড. ইউনূস। বাংলাদেশ আসিয়ানে যোগ দেয়াকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে চায়। কারণ বাংলাদেশ বিশেষ করে ২০২৬ সালে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে, এরপর বাংলাদেশ আর অগ্রাধিকারভিত্তিক শুল্ক সুবিধা পাবে না। মালয়েশিয়া জানুয়ারি থেকে আসিয়ানের সভাপতি হতে যাচ্ছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ড. ইউনূস বলেন, তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বাংলাদেশকে আসিয়ানে স্বাগত জানাতে তার সদিচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছেন। তবে এক্ষেত্রে বেশ কিছু ধাপ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের আসিয়ানে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপটি হবে আসিয়ানের সংজ্ঞা সংশোধনে একটি সর্বসম্মত রেজুল্যেশন নিশ্চিত করা। এর আগে আমরা আসিয়ানের একটি সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের আশা করছি। আসিয়ানের সদস্য দেশগুলো বাংলাদেশের এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ড. ইউনূস।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বিপুল সংখ্যক রাষ্ট্রবিহীন ও নাগরিকত্বের প্রাধিকার-বঞ্চিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই দায় (রোহিঙ্গা) বাংলাদেশ কতদিন বহন করবে? রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আমাদের একটি সুস্পষ্ট গন্তব্য ও একটি অভিন্ন লক্ষ্য ঠিক করা দরকার।

বাংলাদেশ মিয়ানমারে জাতিসংঘ-শাসিত একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এতে করে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা তাদের দেশেই আশ্রয়-শিবিরে থাকতে পারবে। সেখানকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তাদের অন্য কোনো দেশে স্থানাস্তর করার প্রয়োজন হবে না, তারা তাদের নিজেদের বাড়িঘরে ফিরে যেতে পারবে।

শেয়ার করুন
Generating Photo Card...
Please wait...