এলপিজির আমদানি বেশি, সংকটও বেশি!

অনলাইন নিউজ ডেস্ক
০৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪৬ পিএম
এলপিজির আমদানি বেশি, সংকটও বেশি!

দেশে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১১ লাখ ৩৯৩ মেট্রিক টন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে প্রথম ৯ মাসে এলপিজি আমদানি বেড়েছে ৭৭ হাজার ৩৪৯ টন বা প্রায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে পাওয়া আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র দেখা যায়। শুধু গত বছর নয়, বিগত পাঁচ বছরে একই সময়ে এটা সর্বোচ্চ আমদানি। এত আমদানির পরও বাজারে দামও সর্বোচ্চ, সংকটও অতীতের তুলনায় বেশি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা / এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকে এলপিজি আমদানিতে মাসভিত্তিক বেশ ওঠা-নামা আছে। জানুয়ারিতে আমদানি হয় ১ লাখ ৫ হাজার ৬৯২ টন, ফেব্রুয়ারিতে ১ লাখ ৩৩ হাজার ২১৮ টন এবং মার্চে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৬ টন। এরপর এপ্রিলে আমদানি কমে ১ লাখ ৮ হাজার ৭৫ টনে দাঁড়ায়। মে ও জুনে যথাক্রমে ১ লাখ ২২৯ টন ও ১ লাখ ৬ হাজার ৩৭৩ টন এলপিজি আমদানি হয়। জুলাইয়ে আমদানি আরও কমে ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৭০ টন হলেও আগস্টে তা বেড়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টনে ওঠে। সেপ্টেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ১২৯ টন।

মার্চে রেকর্ড, জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন
২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে মার্চে- ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৬ টন। সবচেয়ে কম আমদানি হয়েছে জানুয়ারিতে- ১ লাখ ৫ হাজার ৬৯২ টন। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মাসের আমদানির ব্যবধান প্রায় ৭৬ হাজার ৬০৪ টন।

বিজ্ঞাপন

মার্চে গত বছরের একই মাসের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৬৪ হাজার ৪৩৮ টন বা প্রায় ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতেও গত বছরের তুলনায় আমদানি বেড়েছে প্রায় ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে জুলাইয়ে ২০২৫ সালের তুলনায় আমদানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।

আরও পড়ুন

জানুয়ারির ১৩০৬ টাকার এলপিজি অক্টোবরে হলো ১৮৩৭ টাকা
আগস্টে আবার বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায়। ২০২৫ সালের আগস্টে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৬৫৬ টন, যা চলতি বছরের আগস্টে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন। অর্থাৎ, এক মাসে বেড়েছে ৩৮ হাজার ১০৪ টন বা প্রায় ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে আমদানি সামান্য কমেছে ১ হাজার ৬৩১ টন, অর্থাৎ প্রায় ১ শতাংশ।

২০২৫ সালের বার্ষিক আমদানির ৮০ শতাংশ চলতি বছরের ৯ মাসেই
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩০৫ টন। এর বিপরীতে ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসেই আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪২ টন, যা গত বছরের পুরো বছরের আমদানির প্রায় ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ, অক্টোবর-ডিসেম্বর- এই তিন মাসের আমদানি এখনো যোগ না হলেও চলতি বছরের আমদানি গত বছরের মোট আমদানির বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

এলপিজির কোন সিলিন্ডারের দাম কত, জেনে নিন
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসের গড় মাসিক আমদানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৬০ টন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই গড় ছিল প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৬ টন। অর্থাৎ, গড় মাসিক আমদানিও বেড়েছে প্রায় ৮ হাজার ৫৯৪ টন।

বিজ্ঞাপন

গত ৫ বছরে যে পরিমাণ আমদানি
বিইআরসির তথ্য বলছে, ২০২২ সালে ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ মেট্রিক টন, ২০২৩ সালে ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৭৮৬ মেট্রিক টন, ২০২৪ সালে ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪৭১ মেট্রিক টন, ২০২৫ সালে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩০৫ মেট্রিক টন এবং ২০২৬ সালের ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) এলপিজি আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন।

বিগত ৫ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে আমদানি সর্বোচ্চ
২০২৪ সালে এলপিজি আমদানি ছিল গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ- ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪৭১ টন। ২০২৫ সালে তা কমে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩০৫ টনে দাঁড়ায়। চলতি বছরের মাত্র ৯ মাসেই ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৭৪২ টন আমদানি হয়েছে। বছরের শেষ তিন মাসে আমদানির পরিমাণ স্বাভাবিক থাকলে ২০২৬ সালের মোট আমদানি গত বছরের তুলনায় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আমদানি বাড়লেও বাজারে সংকট কেন?
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এলপিজি আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও বাজার পরিস্থিতি ভিন্ন কথা বলছে। গত মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১৫৮৫ টাকা। কিন্তু খোলা বাজারে ২২০০ থেকে ২৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অক্টোবর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। কিন্তু দাম বাড়ানোর পরেও বাজারে ২২০০ থেকে ২৭০০ টাকায় এলপিজি বিক্রি হচ্ছে। এতে বাজার ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখনো অনেক জায়গায় টাকা দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

বিক্রির তথ্য দিচ্ছেন আমদানিকারকরা
সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়ে ১২ এলপিজি আমদানিকারককে গত ৩ অক্টোবর চিঠি দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

আরও পড়ুন

২৫২ টাকা দাম বাড়ানোর পরও বাজারে এলপিজি ২৭০০ টাকা!
বিইআরসি সূত্র বলছে, চিঠি দেওয়ার পর অধিকাংশ কোম্পানি তথ্য পাঠিয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলমান। কয়েকটি কোম্পানির আমদানির তুলনায় বিক্রির পরিমাণ কম পরিলক্ষিত হয়েছে। এমন চারটি কোম্পানিকে ফিরতি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিইআরসির এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, কয়েকটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নিচ্ছিল। তাদের বিষয়টি অবহিত করার পর দাম কমিয়েছে। এছাড়া চারটির মতো কোম্পানি আমদানির তুলনায় বিক্রির পরিমাণ কম হওয়ায় জবাব চেয়ে আবারও চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমরা অ্যাক্টিভ হয়ে কাজ করছি। আমাদের মনিটরিং টিম কাজ করছে। আমদানিকারকদের চিঠি পাঠিয়েছি। তারা জবাব দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি। অতিরিক্ত দাম রোধে অভিযানও চলছে।-বিইআরসি সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা অ্যাক্টিভ হয়ে কাজ করছি। আমাদের মনিটরিং টিম কাজ করছে। আমদানিকারকদের চিঠি পাঠিয়েছি। তারা জবাব দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি। অতিরিক্ত দাম রোধে অভিযানও চলছে।’

আরও পড়ুন

‘‌সিলিন্ডার নাই, ২৪০০ টাকা দিলে ম্যানেজ করে দিতে পারি’
বাজারে অতিরিক্ত দামের বিষয়ে জানতে চাইলে এলপিজি খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা নিয়ে বেশি কথা বললে অযথা প্যানিক তৈরি হবে। আমরা কাজ করছি। মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও মিটিং করেছি। কোথাও না কোথাও ঝামেলা হচ্ছে। আশা করছি ঠিক হয়ে যাবে।’

বিজ্ঞাপন

একদিকে সরকার নীরব-নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে, অন্যদিকে দাম বাড়িয়ে ভোক্তার পকেট কাটা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে। জন-অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।-ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘একদিকে সরকার নীরব-নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে, অন্যদিকে দাম বাড়িয়ে ভোক্তার পকেট কাটা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে। জন-অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।’

ক্যাব সভাপতি বলেন, ‘জনগণের ওপর বারবার বোঝা চাপানো হচ্ছে। সরকারি দামের বেশি যে নেওয়া হচ্ছে, জনগণের পক্ষে সরকার কি ব্যবস্থা নিচ্ছে! কোনো ব্যবস্থাই দৃশ্যমান না। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো, বিল বেশি উঠছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলো। এখন সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে৷। দিনশেষে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

শেয়ার করুন
Generating Photo Card...
Please wait...