প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেট ভাঙতে চাই কঠোর পদক্ষেপ
বাংলাদেশে প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো নতুন ব্যাধি নয়; বহু বছর ধরে চলে আসা এই অশুভ বাণিজ্য আজ আমাদের জাতীয় জীবনে এক মহাসংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসির মতো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিসিএস, ব্যাংকিং খাত, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা-কোনো ক্ষেত্রই প্রশ্ন ফাঁসের কালগ্রাস থেকে মুক্ত নয়।
মেধাবী বেকার তরুণ-তরুণীরা যখন বছরের পর বছর নিঃস্ব হয়ে রাতদিন পড়াশোনা করে জীবনের একটি ন্যূনতম আশ্রয়ের আশায় নিয়োগ পরীক্ষার হলে বসে, তখন পর্দার আড়ালে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন কিনে সরকারি চেয়ার দখল করে নেয় অযোগ্য কিছু ব্যক্তি। একদিকে মেধার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়, অন্যদিকে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সদস্যরা রাতারাতি কোটিপতি বনে বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি হাঁকিয়ে রাজকীয় জীবনযাপন করে। পক্ষান্তরে নিঃস্ব বেকার তরুণদের অতিবাহিত করতে হয় এক চরম অসহায় ও অনিশ্চিত জীবন।
প্রশ্ন ফাঁসের বিষবৃক্ষ রাষ্ট্রযন্ত্রের কতটা গভীরে শেকড় চালিয়েছে, তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা’ নিয়োগ পরীক্ষার ঘটনা। গত ১০ অক্টোবর ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থীর বাছাই পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল বেলা ১১টায়। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে পরীক্ষা স্থগিত করে।
পরবর্তী সময়ে এসআরবি-এর অভিযানে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা দেখে শিউরে উঠতে হয়। গত ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন-জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর, এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম এবং দুই চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম ও মো. হাসিনুর রহমান সুজন। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প, ব্যাংক চেক, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে প্রকাশ পায়, পরীক্ষার দিন ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্রের মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান এবং সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁকে স্পষ্ট ছবি পাঠান। উত্তরপত্র তৈরি করে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা চুক্তিতে পৌঁছে দেওয়া হতো। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রশ্নপত্রের ‘মূল উৎস’ কে, তা এখনো অজানা। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বরাবরের মতোই দাবি করেছেন, তাঁরা নাকি ফেসবুকে প্রশ্ন পেয়েছেন! রাষ্ট্র কি এতটাই অন্ধ যে, আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর থেকে যেভাবে কেন্দ্রীয় প্রেস বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কক্ষ থেকে প্রশ্ন বের হয়ে যাচ্ছে, তার আসল গোড়ায় তারা পৌঁছাতে পারছে না?
বাংলাদেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বাণিজ্য কোনো বিচ্ছিন্ন বা নতুন ঘটনা নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে প্রশ্নপত্র ফাঁস এক অভূতপূর্ব মহামারী ও উৎসবের রূপ ধারণ করেছিল। কেবল একটি বা দুটি পরীক্ষা নয়, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি), জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসির প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যেন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছিল। তৎকালীন সরকার ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা এসব অপরাধকে দমন করার পরিবর্তে বারবার ‘গুজব’ বা ‘পরামর্শ’ বলে উড়িয়ে দিয়ে অপরাধীদের পরোক্ষভাবে সুরক্ষা জুগিয়েছেন।
কেবল স্কুল-কলেজের পাবলিক পরীক্ষাই নয়, দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সার্ভিস অর্থাৎ সরকারি কর্ম
কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নপত্র ফাঁস পর্যন্ত ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ফাঁস হওয়া পিএসসির ড্রাইভার আবেদ আলীর চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রমাণ করে, প্রায় দুই দশক ধরে কীভাবে বিসিএসসহ ৩০টিরও বেশি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছিল। ড্রাইভার আবেদ আলী ও তাঁর পুত্র সিয়াম মেধার বিনিময়ে টাকা নিয়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসিয়ে দিয়েছেন। পিএসসির মতো একটি সাংবিধানিক সংস্থায় ড্রাইভার আবেদ আলী ও তাঁর ছেলে কীভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান, বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন এবং বিশাল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন, তা গোটা বিশ্ব দেখেছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রশ্ন ফাঁস বাণিজ্যে যে কয়েকজন চুনোপুঁটি ধরা পড়ে, তাদের ভাগ্যে ঠিক কী বিচার ঘটে? আমাদের আইনি ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আসামিরা অতি সহজেই পার পেয়ে যায়। পিএসসি ক্যাডার পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে গ্রেপ্তার আবেদ আলীর বিচার এখনো বছরের পর বছর ধরে চলছে। তার ছেলের মাত্র কয়েক বছরের সাজা হলেও বিপুল অঙ্কের অবৈধ সম্পদ আড়াল করার সুযোগ তারা ঠিকই পেয়ে যান। আমাদের আইনি প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে আসামিদের আর কতদিন কারাভোগ করতে হবে এবং মামলা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা এক বিরাট প্রশ্ন।
সবচেয়ে উদ্বেগ জনক হলো, আমাদের বিদ্যমান ‘পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ বা হালনাগাদ করা আইনি কাঠামো প্রশ্ন ফাঁস প্রতিরোধে অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ও সেকেলে। এই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি এবং জামিনযোগ্য ধারার ফাঁকফোকর এমনভাবে তৈরি, যা দেখে অপরাধীরা ভয় পায় না। অপরাধ দমনের নামে আইনি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার এই যে দৈন্য, বস্তুতপক্ষে এই দৈন্যই অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে। এখন প্রশ্ন জাগে, কেন প্রশ্ন ফাঁসের মতো রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা হচ্ছে না? কেন প্রশ্ন বিক্রি করে অর্জিত কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অনতিবিলম্বে বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের অনুকূলে নেওয়া হচ্ছে না? কারণ, ছয় মাস বা এক বছর সাজা খেটে যদি একজন অপরাধী তার শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অক্ষত রাখতে পারে, তবে এই জেল খাটা তো তার কাছে একধরনের ‘বিজনেস ইনভেস্টমেন্ট’ বা লাভজনক বিনিয়োগের মতো মনে হবে!
যখনই কোনো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে, দু-চারজন ড্রাইভার, কম্পিউটার অপারেটর কিংবা অফিস সহায়ককে গ্রেপ্তার করে তদন্তের ইতি টানা হয়। কিন্তু আবেদ আলীরা ধরা পড়লেও এর নেপথ্যে যাঁরা আছেন, সেই ‘রাঘববোয়ালরা’ কখনো ধরা পড়ে না। কারণ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। যদি এই শিকড় উপড়ে ফেলা না যায়, তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ব্যাধি কখনোই দূর হবে না।
তাই সরকারকে বলতে চাই-আপনারা শিকড়ে হাত দিন। লেজ ধরে টানাটানি করে কোনো লাভ নেই, মাথায় হাত দিন। কারণ, শিকড়ে হাত দিলে যে অনেক রাঘববোয়াল বেরিয়ে আসবে! কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বের করে আনার সহজ সাহস কার বুকে আছে? নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, শুধু কেষ্টা ব্যাটাই চোর নয়, বরং সব সাধু ব্যাটাই এখন চোর!
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের লাখ লাখ মেধাবী বেকার তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে এবং একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে রাষ্ট্রকে তার লেজ ধরে টানাটানি বন্ধ করতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো রাষ্ট্রদ্রোহী অপরাধ রোধে বিদ্যমান ‘পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সবার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অনতিবিলম্বে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নেওয়ার কঠোর বিধান যুক্ত করতে হবে, যাতে কোটি কোটি অবৈধ টাকা জায়েজ করার পথ চিরতরে বন্ধ হয়। শুধু ড্রাইভার, পিয়ন বা ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের বলির পাঠা না বানিয়ে, যে বিজি প্রেস, মন্ত্রণালয় কিংবা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর থেকে প্রশ্ন বের হচ্ছে, এখানকার মূল কুশীলবদের চিহ্ন শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রতিটি স্তরে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অটোমেটেড গোপনীয়তা বজায় রাখা প্রয়োজন। সুতরাং রাষ্ট্রের কাছে আকুল আবেদন-আর লেজ ধরে টানাটানি করবেন না, এবার মূল শিকড়ে হাত দিন। মাথার রাঘববোয়ালদের উপড়ে না ফেললে এই জাতি চিরতরে মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। যা কারো কাম্য হতে পারে না। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com

