গর্ভে ৭ মাসের সন্তান, ফুটপাতেই জীবনযুদ্ধ!
ঢাকার এই ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে-যায়। কেউ হয়তো কয়েক মিনিটের জন্য থামেন, ওজন মেপে কয়েকটা টাকা দিয়ে আবার শহরের ভিড়ে হারিয়ে যান। কিন্তু শেফালির জীবন আটকে আছে ফুটপাতের ওই কয়েক বর্গফুট জায়গাতেই। এখানেই তার কাজ, এখানেই তার অপেক্ষা।
ভাবুন তো, একজন নারী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই সময়ে যার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটু বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার আর একটা নিরাপদ পরিবেশ, তিনি তীব্র গরমের মধ্যে রাজধানীর হাতিরঝিলের ফুটপাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন! না, কোনো শখে নয়, কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।
ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি মেয়েটার নাম শেফালি, তার বাস্তবতার গল্পটা যেকোনো সিনেমার চেয়েও নির্মম।
শেফালির স্বামী জলিল একসময় রিক্সা চালিয়ে টেনেটুনে সংসার চালাতেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে কয়েক মাস আগে তার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। যে মানুষটা একসময় পরিবারের মুখে খাবার জোগাতে দিনরাত রাস্তায় ছুটতেন, আজ তিনি সম্পূর্ণ বিছানায় শয্যাশায়ী। এই দম্পতির দুনিয়াতে আপন বলতে আর কেউ নেই, তারা দুজনই দুজনের একমাত্র ভরসা।
একদিকে ক্যান্সারে আক্রান্ত স্বামীর চিকিৎসার খরচ, ঘরে ছোট্ট একটা মেয়ের খাবার জোগানো, আর অন্যদিকে পেটে অনগত সন্তান, সব মিলিয়ে শেফালির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। অভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বেশ কয়েক মাস ধরে তাদের ঘরে ঠিকমতো চুলাও জ্বলে না। কখনো একবেলা খাবার জোটে, তো কখনো তাও অনিশ্চিত।
কোনো উপায় না পেয়ে, এক দয়াবান মানুষের দেওয়া একটা ওজন মাপার মেশিন নিয়ে শেফালি এখন রাস্তায় বসেন। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে মানুষের ওজন মাপেন তিনি। কেউ ১০-২০ টাকা দিলে তা দিয়ে কোনোমতে চাল কিনে স্বামী-সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন।
ডেলিভারির আর মাত্র ৩ মাস বাকি, অথচ এই অসহায় শেফালি বলছেন,‘এখন আমি কোন দিকে যাবো? কি করবো? কার কাছে যাবো? আমার কোন কিছু বলার নাই। একজন আমাকে ওজন মাপার মেশিন দান করলো সেটা নিয়ে আমি রাস্তায় বসে আছি, মানুষের ওজন মাপতাছি। কেউ ১০-২০ টাকা দিলে তা দিয়ে কোনোমতে চাল কিনে স্বামী-সন্তানের মুখে খাবার জোগান দিয়ে থাকি। ’
অন্যদিকে বিছানায় শুয়ে স্বামী জলিলও কাঁদছেন, ‘আমার বউয়ের ডেলিভারি হইবো, পোলাপানের মুখে কী দিমু? আমার চিকিৎসার খরচ কেমনে করামু?’
ঢাকার এই ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে-যায়। কেউ হয়তো কয়েক মিনিটের জন্য থামেন, ওজন মেপে কয়েকটা টাকা দিয়ে আবার শহরের ভিড়ে হারিয়ে যান। কিন্তু শেফালির জীবন আটকে আছে ফুটপাতের ওই কয়েক বর্গফুট জায়গাতেই। এখানেই তার কাজ, এখানেই তার অপেক্ষা।

