শহীদ জিয়ার এক অমর সৃষ্টি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ
আজ ১ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে এক শুভক্ষণে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর আগে বাকশালী ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিল শুধুমাত্র একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার জন্য। সেই মৃত গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সুযোগ করে দেন আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী সহ সকল রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করার। আর সেই থেকেই বাংলাদেশে বহুমাত্রিক গণতন্ত্রের পথচলা আবারও শুরু হয়।
শহীদ জিয়ার সৃষ্টি বিএনপি বিগত ৪৭ বছরে কয়েকবার সবার অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠুু নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে দেশ ও জনগণের সমৃদ্ধি ও কল্যাণে কাজ করে গেছে। তবে ৪৭ বছরের পথচলা বিএনপির জন্য পুষ্পশোভিত ছিল না। প্রথম দফায় স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে ৯ বছরের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন, পরবর্তীতে ২ বছরের ১/১১ তত্ত্বাবধাক সরকার এবং সর্বশেষ গত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন, হামলা, মামলা, গুম-খুনের স্টিমরোলার চলেছে বিএনপির ওপর।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে তাই ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উৎসবের দিনটি ছিল হামলা-মামলা মাথায় নিয়ে নিছক আনুষ্ঠানিকতা। তবে গতবছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী স্বৈরাচার সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে গেলে দেশে ফিরে আসে শান্তির পরিবেশ, যেটিকে দেশের মানুষ বলছেন দ্বিতীয় বিজয় দিবস। দেশের অন্যান্য মানুষের মতো রাজনৈতিক দল হিসেবে সবচেয়ে নির্যাতনের শিকার বিএনপিতেও বিরাজ করছে স্বস্তির পরিবেশ। তাই গত বছরের মতো এবারের ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীটি আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলের ১৬ বছরের চেয়ে ভিন্ন রকম চিত্র দেখছে দলটির নেতাকর্মীরা।
তারা বলছেন, ২০০৭ সালে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নামে মামলা, জেল-জুলুম, নির্যাতন, গুম-খুনে ভীত-সন্ত্রস্ত্র ছিলেন তারা। আর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হোক কিংবা অন্য যে কোনো কর্মসূচি থাকলেই দলটির নেতাকর্মীদের নামে শুরু হতো নতুন নতুন মামলা, গায়েবি মামলা, গ্রেফতার ও নির্যাতন। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই ধরনের কোনো ভয়-ভীতি নেই নেতাকর্মীদের মধ্যে।
তবে গতবছর দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যার কারণে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছিল। এবারই তাই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলটি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক পৃথক বাণীতে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
জনাব তারেক রহমান বলেন, এখনো প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আইনের শাসন, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ, সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলেই জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর এজন্য জনগণের নির্বাচিত জবাবদিহিমূলক সরকার অতীব জরুরি।
তিনি বলেন, গত দেড়যুগব্যাপী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে শহীদদের আত্মদান সার্থক হবে, যদি আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি। এটিই হোক বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভলগ্নে আমাদের অঙ্গীকার। দেশজুড়ে যেন আর কখনোই গুম, গুপ্তহত্যা, বিচার-বহির্ভূত হত্যা, নারী ও শিশুদের ওপর পৈশাচিকতা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, টাকা পাচারের মতো ঘৃণ্য বিভীষিকার পুনরাবৃত্তি না হয়। নতুনভাবে আবির্ভূত মব সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। কারণ এটি আইন-বহির্ভূত একটি হিংসাত্মক আচরণ, যা জনমনে ভীতি ও আতঙ্ক তৈরি করে। জনগণের অধিকার আদায়ে তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করাসহ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা আবারো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই এখন বিএনপির মূল লক্ষ্য।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র দলের কেন্দ্রীয় আদর্শ। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মতে ‘ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক ভুখ-ের ওপর ভিত্তি করে ‘বাংলাদেশি পরিচয়’ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে আলাদা ও নিজের কাছে অনন্য।’’ তাই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপির সব নেতাকর্মী নিরলস ও একনিষ্ঠ আপসহীন লক্ষ্যে স্থির।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক পরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য ছাত্র-জনতা নিঃস্বার্থ আত্মদানের মধ্য দিয়ে গত বছর জুলাই-আগস্টে স্বৈরাচারী দানব আওয়ামী সরকারের পতন হয়েছে। এখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে গণতন্ত্রকামী দলগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। এতদিন গুম-খুনের আতঙ্ক মানুষের নিত্য সঙ্গী ছিল। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন সুদৃঢ় করতে পারলেই নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। দুঃশাসনে যে কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল সেটি সমূলে উপড়ে ফেলে একটি পরমতসহিষ্ণু, শান্তিময় এবং মানবিক সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই জাতীয়তাবাদী শক্তির মূল লক্ষ্য হতে হবে।
‘আজ থেকে ৪৭ বছর আগে দেশের এক চরম ক্রান্তিকালে মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, বিশ্ববরেণ্য প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এ দেশের মানুষকে একদলীয় দুঃশাসনের অরাজকতার অব্যাহত ধারায় ৭৫’র পটপরিবর্তনের পর ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্তের যাত্রা শুরু হলে ১৯৭৮ সালে ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।’
৪ বার ক্ষমতায় ও দুইবার বিরোধী দলে থাকা এই দলটি বিভিন্ন সময় নানা বাধা-বিপত্তির মুখে পড়েছে। তবে সংগঠনের বিস্তৃতি থেমে থাকেনি, বেড়েছে জনসমর্থনও।
বিএনপি প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৭৭ সালের জুন মাসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি নিয়ে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগো দল) গঠন করেন। ওই দলের আহ্বায়ক হয়েছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। এরপর জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করে জিয়াউর রহমান ওই বছরে প্রত্যক্ষ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। জাগো দল, ন্যাপ (মশিউর রহমান যাদু মিয়া), ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম-কর্নেল আকরর হোসেন), লেবার পার্টি (মতিন) ও মুসলিম লীগ (শাহ আজিজুর রহমান) নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ৩১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়- যেখানে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, শাহ আজিজুর রহমান, প্রফেসর ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, এস এ বারী, ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল হালিম, জামাল উদ্দিন আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) মাজেদ-উল হক, ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হক, ব্যাস্টিার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত, এম সাইফুর রহমান, মাওলানা আব্দুল মতিন, কর্নেল (অব.) আ স ম মোস্তাফিজুর রহমান, লে. কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন, আতাউদ্দিন খান প্রমুখ নেতা ছিলেন।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। দলের ১১ সদস্যের স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছরেরও কম সময় পরে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। এ সময় গৃহবধূ ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে পার্টির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তখন থেকে প্রায় ৯ বছর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে গৃহবধূ থেকে দেশনেত্রীতে পরিণত হন বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি হন দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। এরপর আরো দুইবার নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। তবে ১/১১-এর সেনা-সমর্থিত সরকারের শাসনামল থেকে একটানা প্রায় ১৮ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। তবে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের রাতের নির্বাচনে দলটি অংশ নিলেও ভূমিধস পরাজয় হয়। এরপর থেকেই দল পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিভিন্ন জেলা কমিটির সাথে সাথে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনেও আনছেন নতুন নেতৃত্ব। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনও বর্জন করে বিএনপি। যে নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির কর্মসূচি:
৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি। ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যেÑ গতকাল রোববার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আজ ১ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, বেলা ১১টায় শেরে বাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন। এছাড়া এদিন সারা দেশে সব মহানগর ও জেলায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও র্যালি হবে।
২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নয়াপল্টনের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি হবে। ৩ সেপ্টেম্বর দেশের সব উপজেলা ও পৌর এলাকায় আলোচনা সভা ও র্যালি হবে। ৪ সেপ্টেম্বর সব মহানগর, জেলা-উপজেলায় বৃক্ষরোপণ, মৎস্য অবমুক্তকরণ, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, ক্রীড়া অনুষ্ঠান হবে। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় একটি গোলটেবিল আলোচনা হবে।




আপনার মতামত লিখুন