ব্যক্তির জন্য প্রতিষ্ঠান ‘বন্ধ করবে না’ সরকার: গভর্নর
অন্তর্বর্তী সরকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অচল না করার নীতি অনুসরণ করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, এলসি খোলার অনুমতি দেওয়ায় এস আলম গ্রুপ ও সামিট গ্রুপের কারখানাগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে।
তিনি বলেন, বেক্সিমকো টেক্সটাইল ব্যতীত এই গ্রুপের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই সচল রাখা হয়েছে। এস আলমের এসএস পাওয়ারও চলছে। কারণ, সেটি দেশের সম্পদ।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত এই সংলাপে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন- অর্থপাচারে জড়িত অনেকেই এখনও স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালাচ্ছেন। উত্তরে গভর্নর স্পষ্ট করে বলেন, “ব্যক্তিগত অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, এস আলম দেশে না থাকতে পারে, তাকে থাকতে দেওয়া হোক না হোক- সেটা পরবর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। সামিটের মালিকরাও দেশে নেই, কিন্তু তাদের কারখানাগুলো সব খুলে দেওয়া আছে। আমরা চাই উৎপাদন যেন কোথাও ব্যাহত না হয়। ব্যক্তির কারণে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে তিনি জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। ‘এখানে কর্মসংস্থান হয়, মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। আইনগত প্রক্রিয়া চলবে, কিন্তু উৎপাদন যেন থেমে না যায়, সে বিষয়ে আমরা সচেতন। এলসি সুবিধা দিয়ে আমরা কারখানাগুলোকে সচল রেখেছি। এখনো কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি।
গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বেক্সিমকো, সামিট, এস আলমসহ বড় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন। তখন বেক্সিমকোর ভাইস চেয়ারম্যান এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হন। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান এস আলম দেশত্যাগ করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ব্যাংক হিসাব, স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ জব্দসহ মালিকানা হস্তান্তর নিষিদ্ধ করে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে।
গভর্নর বলেন, ‘শক্তি প্রয়োগে কিছু হবে না, আমাকে আইনের পথেই যেতে হবে। অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আমরা মামলা করেছি। কিন্তু আদালতের প্রক্রিয়া তো আমাদের হাতে নেই-নিজেদের গতিতে এগোচ্ছে। সেটিও আমরা বিবেচনায় রেখেছি।’
তিনি জানান, ভবিষ্যতে অনিয়ম ঠেকাতে সুশাসন নিশ্চিত করাই উদ্দেশ্য। অর্থ ঋণ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত আদায়ের জন্য তালিকা করা হচ্ছে। আদালতের রায়ের পর বিভিন্ন আইনি ব্যয় ও জটিলতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
‘কিছু ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে আইনজীবীর সহায়তায় মামলা ঘুরিয়ে ২০ বছর সুদ ছাড়াই চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন- এই প্রবণতা আছে। তাদের নিয়েই আমাদের চলতে হয়,’ যোগ করেন তিনি।
তিনি জানান, এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার প্রকল্প বন্ধ না যায় তা নিশ্চিত করতে তিনি নিজেই ব্যাংকারদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন।
‘এসএস পাওয়ারে আড়াই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীও রয়েছে। ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ মালিকানা চীনা অংশীদারের, বাকি ২৫ শতাংশ এস আলমের। ওই ২৫ শতাংশ মালিকানা আমরা ব্লক করে রেখেছি। অর্থাৎ তা কার্যত বাজেয়াপ্ত। তাহলে আমি কি এসএস পাওয়ার বন্ধ করে দেব? অবশ্যই নয়,’ তিনি বলেন।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের কৌশল পরিষ্কার- আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ হবে, ব্যক্তিগত দায় কেউ এড়াতে পারবে না; কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে দেব না। বেক্সিমকো টেক্সটাইল ছাড়া কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।’
সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যু ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খান। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী এবং এনবিআর চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুর রহমান।





আপনার মতামত লিখুন