দয়া করে ১২ তারিখ পর্যন্ত কোনো চাঁদাবাজি করবেন না: বিএনপি নেতা
ভোটের প্রচারণায় প্রার্থীরা সাধারণত প্রতিপক্ষের সমালোচনা বা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু চট্টগ্রাম-১৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজামের গলায় শোনা গেল ভিন্ন সুর। নিজ নির্বাচনী এলাকার ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র চাতরীতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রকাশ্য জনসভায় চাঁদাবাজদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন যাতে অন্তত আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন পর্যন্ত তারা যেন শান্ত থাকে। যেই ভিডিও ইতোমধ্যে ব্যাপক ভাইরাল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ৫৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, সরওয়ার জামাল নিজাম উপস্থিত জনতা ও নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্য রাখছেন। তিনি চাতরী এলাকাকে আনোয়ারার ‘অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন।
ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, চাতরী হলো আনোয়ারার প্রাণকেন্দ্র। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোন, যেখানকার ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পুরো এলাকার অর্থনৈতিক গতিশীলতা নির্ভর করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি চলছে। এরপরই তিনি হাত জোড় করে চাঁদাবাজদের উদ্দেশে বলেন, আমি দুই হাত জোড় করে বলছি, আপনারা যারা চাঁদাবাজি করছেন, দয়া করে ১২ তারিখ পর্যন্ত এই কাজ করবেন না।
স্থানীয় সূত্রমতে, নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করার পর থেকেই আনোয়ারার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানায় নামধারী কিছু দুর্বৃত্তের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সরওয়ার জামাল নিজাম মনে করছেন, এসব অপকর্মের দায় শেষ পর্যন্ত বিএনপির ওপর এসে পড়তে পারে।
বক্তৃতায় তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও বলেন, “বিএনপির গায়ে কালিমা লেপনের চেষ্টা করা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” অর্থাৎ, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি চাঁদাবাজি করে দলের বদনাম করে, তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
চাতরী ও কর্ণফুলী এলাকার ব্যবসায়ীরা সরওয়ার জামাল নিজামের এই সাহসিকতাপূর্ণ ও অকপট বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, নেতারা সাধারণত চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করেন না। কিন্তু নিজাম সাহেব প্রকাশ্যে এটি বলে অন্তত আমাদের কষ্টের কথাটি তুলে ধরেছেন। তবে ১২ তারিখের পর কী হবে, তা নিয়ে আমাদের ভয় রয়েই গেছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য সরওয়ার জামাল নিজাম ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়কের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম-১৩ আসনে লড়াই মূলত বহুমুখী। বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ছাড়াও এই আসনে লড়ছেন মাহমুদুল হাসান (জামায়াতে ইসলামী), মোহাম্মদ এমরান (এনডিএম), এস এম শাহজাহান (বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট) ও আবদুর রব চৌধুরী (জাতীয় পার্টি)।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরওয়ার জামাল নিজামের এই বক্তব্য দুই অর্থ বহন করে। একদিকে তিনি যেমন সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে তিনি স্বীকার করে নিলেন যে এলাকায় তাঁর দলের বা অন্য কোনো প্রভাবশালী মহলের চাঁদাবাজির সমস্যাটি প্রকট। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এ ধরনের স্বীকারোক্তি যেমন সাহসের পরিচয় দেয়, তেমনি তা আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতাকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
আনোয়ারা-কর্ণফুলীর মানুষের এখন একটাই চাওয়া- কেবল ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্তই নয়, বরং স্থায়ীভাবে এই অঞ্চলটি যেন সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত থাকে। সরওয়ার জামাল নিজামের এই ‘হাত জোড়’ করা মিনতি চাঁদাবাজদের হৃদয়ে কতটুকু পরিবর্তন আনে, তা সময় বলে দেবে। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় এমন দৃশ্য বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে বিরল এক অভিজ্ঞতা।






আপনার মতামত লিখুন