শেষ হলো ভোট উৎসব-২০২৬: অপেক্ষা ফলাফলের
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় সনদের ওপর ঐতিহাসিক গণভোটের ভোটগ্রহণ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া কোনো বিরতি ছাড়াই বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা পরিচালিত হয়।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এক উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। বিকেলের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর এখন প্রতিটি কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স সিলগালা করে ভোট গণনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি কর্মকর্তারা।
নির্বাচন কমিশনের পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী, বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে যেসব ভোটার কেন্দ্রের সীমানায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের সবার ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নতুন করে কাউকে লাইনে দাঁড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি।
রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সময় শেষ হওয়ার পরও অনেক কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি থাকায় ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া কিছুটা দীর্ঘায়িত হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, লাইনে থাকা প্রতিটি ভোটারের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা হবে এবং কারিগরি নিয়ম মেনেই স্বচ্ছতার সাথে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটারদের অভূতপূর্ব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানীর গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডি এলাকার কেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকেই ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বনানীর ৫১ নম্বর কেন্দ্রসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে দুপুরের আগেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট সংগৃহীত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কোনো কোনো কেন্দ্রে বেলা ১১টার মধ্যেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ভোট কাস্টিং সম্পন্ন হয়, যা দীর্ঘ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের ইঙ্গিত দেয়। কিছু বিচ্ছিন্ন গোলযোগের খবর পাওয়া গেলেও সামগ্রিকভাবে সারা দেশের নির্বাচনি পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ছিল বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামীর একজন প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত থাকলেও অবশিষ্ট ২৯৯টি সংসদীয় আসনে আজ ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের নির্বাচনি ময়দানে মোট ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা ২৭৫ জন।
নির্বাচনি লড়াইয়ে শীর্ষ দলগুলোর মধ্যে বিএনপি সর্বোচ্চ ২৯১ জন প্রার্থী দিয়ে মাঠে রয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন ২৫৮ জন, জামায়াতে ইসলামী ২২৯ জন, জাতীয় পার্টি ১৯৮ জন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির ৩২ জন প্রার্থী তাঁদের নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। দেশের ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজারের বেশি ভোটারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে ৮ লক্ষাধিক নির্বাচনি কর্মকর্তা সরাসরি দায়িত্ব পালন করেছেন।
নির্বাচনের দিন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারাদেশে প্রায় ৯ লাখ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসারের সমন্বিত টহল ভোটারদের মনে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। একই সাথে দেশি-বিদেশি প্রায় ৫৬ হাজার পর্যবেক্ষক এই ঐতিহাসিক ভোট প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন।
ভোটগ্রহণ শেষে এখন প্রতিটি কেন্দ্র থেকে প্রিজাইডিং অফিসাররা প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করবেন, যা পরবর্তীতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আগামীর নতুন নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের গতিপথ নির্ধারিত হবে—এমন প্রত্যাশা নিয়েই এখন ফলাফলের অপেক্ষায় পুরো দেশ। সব বাধা কাটিয়ে একটি সফল নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারাকে বর্তমান প্রশাসনের জন্য এক বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।




আপনার মতামত লিখুন