ম্যার্ৎসের সঙ্গে ট্রাম্পের বিবাদ: জার্মানি থেকে ৫০০০ সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎসের মধ্যে চলমান বিবাদের মধ্যে জার্মানি থেকে ৫,০০০ সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
বিবিসি লিখেছে, ইরানি আলোচনাকারীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ‘লজ্জিত’ হয়েছে বলে জার্মান নেতা ইঙ্গিত দেওয়ায় তার সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। এর পরদিনই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এল।
গত বৃহস্পতিবার সোশাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ম্যার্ৎস ‘খুবই বাজে কাজ করছেন’ এবং অভিবাসন, জ্বালানিসহ তার ‘সব ধরনের সমস্যা’ রয়েছে। ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প।
জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিপুল সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশটিজুড়ে বিভিন্ন ঘাঁটিতে ৩৬ হাজারের বেশি সক্রিয় সেনা মোতায়েন ছিল।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছ থেকে এই নির্দেশ এসেছে।
তিনি বলেন, “ইউরোপে বাহিনীর অবস্থান নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার পর এবং যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে এ সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে।”
নেটো জোটের দীর্ঘদিনের সমালোচক ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি ফের চালু করার অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় মিত্রদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন।
ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি সম্ভবত তা করব—দেখুন, কেন করব না?
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ইতালির প্রতিক্রিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “ইতালি আমাদের কোনো সাহায্য করেনি এবং স্পেন ছিল ভয়াবহ।”
ট্রাম্প বলেন, “সব ক্ষেত্রেই তারা বলেছে, ‘আমি এর মধ্যে জড়াতে চাই না’।”
ম্যার্ৎস এই সপ্তাহের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বলেছিলেন, “আমেরিকানদের স্পষ্টত কোনো কৌশল নেই”। যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার ‘কৌশল’ তিনি দেখতে পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “ইরানিরা স্পষ্টতই আলোচনায় অত্যন্ত দক্ষ, অথবা বলা যায় আলোচনা না করতে অত্যন্ত দক্ষ; তারা আমেরিকানদের ইসলামাবাদ পর্যন্ত সফর করিয়ে কোনো ফল ছাড়াই ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে।”
ম্যার্ৎস এও বলেন, ‘পুরো জাতি’ ইরানি নেতৃত্বের মাধ্যমে ‘লজ্জিত’ হচ্ছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প তার প্লাটফর্ম ট্রুথ সোশালে বলেন, ম্যার্ৎস মনে করেন- ‘ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা ঠিক আছে’ এবং তিনি ‘কী বলছেন তা নিজেই জানেন না’।
পোস্টে লেখা ছিল, “এ কারণেই জার্মানি অর্থনৈতিকভাবে এবং অন্যান্য দিক থেকে এত খারাপ করছে!”
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ওয়াশিংটনে জার্মান দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে সবচেয়ে বেশি মার্কিন সেনা রয়েছে; এর পরে ইতালিতে রয়েছে ১২ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার সেনা।
তাদের অনেকেই দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানির কাইজারস্লটার্ন শহরের বাইরে রামস্টেইন বিমান ঘাঁটিতে অবস্থান করছেন। ট্রাম্প এর আগেও জার্মানিতে সেনা কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তবে সেগুলো কার্যকর হয়নি। একমাত্র জাপানে এর চেয়ে বেশি মার্কিন সেনা উপস্থিতি রয়েছে।
২০২০ সালে জার্মানি থেকে ১২ হাজার সেনা সরিয়ে ইউরোপে অন্য কোনো নেটো দেশে বা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি প্রস্তাব কংগ্রেস আটকে দিয়েছিল; পরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তা বাতিল করেন।
সেই সময় ট্রাম্প জার্মানিকে ‘খেলাপি’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। কারণ দেশটির সামরিক ব্যয় নেটোর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ২ শতাংশের অনেক নিচে ছিল।
তবে ম্যার্ৎস সরকারের আমলে সেই চিত্র নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৭ সালে জার্মানি ১০৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে—আগামী বছর তাদের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র গত বছর রোমানিয়া থেকেও সেনা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা ছিল ইউরোপ থেকে মার্কিন সামরিক মনোযোগ সরিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নেওয়ার ট্রাম্পের পরিকল্পনার অংশ।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাদু-দিনেল মিরুজ্জা বলেন, হেগসেথ রোমানীয়দের নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও মনোযোগ দেওয়ার কথা জানানোর পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তটি ট্রাম্পের সহকর্মী কিছু রিপাবলিকান এবং রাশিয়া প্রশ্নে সতর্ক থাকা পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছ।







আপনার মতামত লিখুন