মৌসুমি ব্যবসায়ীদের লোকসান বেশি
এবারও হতাশ চামড়া ব্যবসায়ীরা, দাম গত বছরের চেয়েও কম
সরকার এবছর কুরবানির গরুর চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় বাড়ালেও রাজধানীতে সেই দরে বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রেতারা বলছেন, তারা এবারও সরকারি নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে তারা পুরোপুরি হতাশ।
রাজধানীর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে সেই দামে চামড়া কেনার কোনো নিশ্চয়তা তারা পাননি। ট্যানারি মালিকরা গত বছরের তুলনায় কম দাম দিচ্ছেন। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও কম দামে চামড়া কিনছেন।
তবে ট্যানারি মালিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় চামড়ার দাম কমেনি, বরং প্রতি পিসে ৫০–৬০ টাকা বেড়েছে। কিন্তু সরেজমিনের অনুসন্ধান সেকথা বলছে না।
রাজধানীর অনেক চামড়া বিক্রেতার অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় তারা প্রতি চামড়ায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম পেয়েছেন। পাশাপাশি আগের বছরের মতোই ব্যবসায়ীরা ছাগলের চামড়া কেনায় তেমন আগ্রহ দেখাননি। ফলে তাদের বেশ লোকসান হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে রাজধানীর খিলগাঁও, রামপুরা, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, উত্তরা, ক্যান্টনমেন্ট (বালুঘাট) এলাকায় বিভিন্ন ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
এবার অধিকাংশ কাঁচা গরুর চামড়া ৫০০-৬৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যেখানে গত বছর একই ধরনের চামড়া ৭০০-৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এ বছর সরকার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বাড়িয়েছে।
ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২-৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০-৬৫ টাকা।
এছাড়া ছাগলের লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং বকরি ছাগলের চামড়ার দাম ২২-২৫ টাকা প্রতি বর্গফুট।
এই হিসাব অনুযায়ী, একটি ছোট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৯৯০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হতে পারে। মাঝারি আকারের চামড়ার দাম অন্তত ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা, আর বড় চামড়ার দাম ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
সাধারণত বড় গরুর চামড়ার আয়তন ৩১–৪০ বর্গফুট, মাঝারি গরুর ২১–৩০ বর্গফুট ও ছোট গরুর ১৬–২০ বর্গফুট হয়ে থাকে।
খিলগাঁওয়ের একজন মৌসুমি চামড়ার ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি ছোট কাঁচা চামড়া ৪৫০ টাকায়, মাঝারি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায় ও বড় চামড়া ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় কিনেছি। তিনি বলেন, দুপুর ১টা ২০ মিনিট পর্যন্ত আমি ৩০টি কাঁচা চামড়া কিনেছি। ৩০০টি কেনার পরিকল্পনা আছে।’
মিরপুরের আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী জানান, আমি ছোট চামড়া ৪০০–৪৫০ টাকা, মাঝারি ৫০০ টাকা ও বড় চামড়া ৫৫০–৬০০ টাকায় কিনেছি। কিছুক্ষেত্র একটু কমবেশি হচ্ছে। কারণ গত বছরের তুলনায় এবার দাম কিছুটা কম। যেহেতু আমরা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে যে দাম পাচ্ছি, সেই দাম অনুযায়ীই আমরা চামড়া কিনছি।’
ধানমন্ডি এলাকার একজন চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, ‘এবার ছাগলের চামড়ার দাম নেই বললেই চলে। যারা গরুর চামড়া বিক্রি করতে নিয়ে আসেন, তাদের অনেক সময় প্রতি পিসে মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকা দেওয়া হয়, আর কিছু ক্ষেত্রে কোনো টাকা না দিয়েই চামড়া নিয়ে নেওয়া হয়। সবমিলিয়ে ব্যবসা খুব বেশি ভালো যাচ্ছে না ভাই।’
তবে এ বছর চামড়ার দাম কমেনি বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, ‘এ বছর কাঁচা চামড়ার দাম কমেনি; বরং গত বছরের তুলনায় ২০-৫০ টাকা বেশি রয়েছে। আমি নিজেই ৬৫০ টাকা থেকে ৯৫০ টাকা পর্যন্ত দামে চামড়া কিনেছি।’
তিনি বলেন, রাজধানীতে কাঁচা চামড়ার বাজার যেন ঠিক থাকে, এজন্য ট্যানারিগুলো সরাসরি কাঁচা চামড়া কিনে থাকে। আজ বিকেল পর্যন্ত চামড়ার বেচাকেনা সেভাবে জমেনি। এ কারণে কেউ কম দাম পেয়ে থাকতে পারেন। সন্ধ্যার দিকে দাম আরও বাড়তে পারে।
প্রসঙ্গত, ট্যানারি মালিকরা এ বছর ৭৫ লাখ থেকে ৮০ লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে তারা রাজধানীতে সরাসরি প্রায় ৮০ শতাংশ চামড়া কেনার পরিকল্পনা করছেন। গত বছর তারা রাজধানী থেকে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৮ লাখটি চামড়া সরাসরি কিনেছিল।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার। এর বিপরীতে গরু-ছাগলসহ কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু।
বলে রাখা ভালো, এবছর রাজধানীর বিভিন্ন হাটে অসংখ্য গরু অবিক্রীত রয়ে গেছে। কিছু গরু একেবারেই কম মূল্যে বাধ্য হয়ে বিক্রি করেছেন অনেকেই। তাই এখনো সম্পূর্ণ চামড়া কালেকশন হয়নি বলেও জানান কিছু ব্যবসায়ী। তাদের মতে, ঈদ পরবর্তী ২-৩ দিনে চামড়া ব্যবসায়ীদের একটা অংশ ভালো মুনাফা পাবে। তবে অধিকাংশ ব্যবসায়ীই লোকসান গুনবে বলে দাবি তাদের।





আপনার মতামত লিখুন