রাজারহাটে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা সরকারি খাদ্য গুদামে চলতি বোরো মৌসুমে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যে আয়োজিত লটারি প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় প্রকৃত চাষিদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা বলে ‘ডিজিটাল লটারি’ করা হলেও পর্দার আড়ালে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী, অকৃষক এবং সিন্ডিকেটের সুবিধা পাইয়ে দিতে নানা অনিয়ম ও চাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা একাধিক ভুক্তভোগী কৃষকের দাবি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির জন্য অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া থেকেই জটিলতা শুরু হয়। লটারির মাধ্যমে ৪১৭ বা ৪১৮ জন কৃষককে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হলেও তালিকায় এমন অনেক নাম এসেছে যাদের নিজস্ব কোনো ফসলি জমি নেই কিংবা যারা বোরো চাষই করেননি এবং একই পরিবারের ৮/১০ জন তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সেই সাথে একই নাম বিভিন্ন ইউনিয়নের তালিকায় দেখা যায়।
স্থানীয় প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও চালকল মালিকদের পকেটভুক্ত ব্যক্তিদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে ভুয়া আবেদন করানো হয়েছে। লটারিতে তাদের নাম আসার পর ব্যাকডোর দিয়ে সেই স্লিপ বা বরাদ্দ চড়া দামে সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।

অনেক প্রান্তিক কৃষক অভিযোগ করেছেন, কৃষি কার্ড এবং যথাযথ প্রমাণাদি থাকা সত্ত্বেও ডাটাবেজে বা লটারির চূড়ান্ত তালিকায় তাদের নাম ওঠেনি। বাজারে ধানের দাম যখন কম, তখন সরকার নির্ধারিত ভালো মূল্যে (প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে) ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
উমর মজিদ ইউপি’র হামিজ মিয়া(৭৫) বলেন, “হামরা দিনরাত কষ্ট করি ধান আবাদ করলং, আর গুদামোত ধান দিবার পাইলো না। লটারির নাম করি যারা জীবনে মাঠোত নামে নাই, বাহে তাগোরে নাম উঠছে! এইটা কেমন ডিজিটাল লটারি?”
খাদ্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে রাজারহাট উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন থেকে মোট ২,১৬৮ জন কৃষক অনলাইনে আবেদন করেছিলেন। এর মধ্য থেকে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ৪১৭/৪১৮ জন কৃষককে মনোনীত করা হয়, যেখানে প্রতিজন কৃষক সর্বোচ্চ ৩ মেট্রিক টন ধান সরকারি গুদামে সরবরাহ করতে পারবেন।
লটারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতার দাবি জানিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, লটারি প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO), কৃষি কর্মকর্তা এবং খাদ্য নিয়ন্ত্রকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে ম্যানুয়ালি কোনো নাম যুক্ত বা বাদ দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
তবে মাঠ পর্যায়ের সচেতন মহলের মতে, লটারির সফটওয়্যার বা প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হলেও আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই-বাছাই (Verification) প্রক্রিয়ায় গলদ ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তাদের সঠিক তদারকি না থাকায় অকৃষক সহ ধান ব্যবস্যায়ীরা তালিকায় ঢোকার সুযোগ পেয়েছে, যা সামগ্রিক লটারি প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এবিষয়ে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) কে একাধিক বার কল দিলে কল রিসিভ হয়নি পরে, কৃষি অফিসার, সাইফুন্নাহার সাথী’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনলাইনে আবেদন করছিলেন তো এবিষয়ে ফুড অফিসার বলতে পারবেন, পরে ফুড অফিসারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ করা হয়েছে, এটিতে আমাদের কোন হাত নেই।
অনিয়ম ও ডিজিটাল কারচুপির এই অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা পুনর্মূল্যায়ন করার দাবি জানিয়েছেন রাজারহাটের সর্বস্তরের প্রান্তিক চাষিরা।
অন্যথায় সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং প্রকৃত কৃষকের বদলে সিন্ডিকেটের পকেট ভারী হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল#




আপনার মতামত লিখুন