ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক বসাল বাংলাদেশ ব্যাংক
চেয়ারম্যান বসানো নিয়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই এবার ইসলামী ব্যাংকের পুরো পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ‘আমানতকারীদের স্বার্থে ও জনস্বার্থে’ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রোববার (১৪ জুন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমে বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ক্ষমতাবলে আমানতকারীদের স্বার্থে ও জনস্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক আজ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আরিফ হোসেন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন।
শরিয়াহভিত্তিক এ ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয় কোরবানি ঈদের আগে। গেল ২৪ মে পদত্যাগ করেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান। সেদিনই নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ঈদের পর এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ব্যাংকটির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন সাধারণ গ্রাহকরা। ‘গ্রাহক ফোরাম’ ব্যানারে তখন থেকে আন্দোলন করে আসছেন তারা।
চলমান অস্থিরতার মধ্যে গত কয়েক দিনে ব্যাংকটি থেকে গ্রাহকরা ৩ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বলে খবর আসে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা গড়ায় জাতীয় সংসদেও।
ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান বসানোর পর আলোচনার মধ্যে ফের ব্যাংকটি ‘দখলের চেষ্টা’ হচ্ছে বলে অভিযোগ তোরেন বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এর জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ব্যাংকটিকে “অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে গত বুধবার ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক বসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পর্যবেক্ষকের দাযিত্ব দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আশ্রাফুল আলমকে।
পর্যবেক্ষক বসানোর পরও আন্দোলন থামেনি। সবশেষ শনিবার চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়াসহ সাত দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে ‘গ্রাহক ফোরাম’। সবশেষ রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ধার পায় ইসলামী ব্যাংক।
সকালে টাকা পাওয়ার পর বিকাল ৪টায় গভর্নরের সঙ্গে দেখা করতে যান ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইনসহ ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী কর্মকর্তারা। গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকের পর রাত পৌনে ১০টার দিকে বতর্মান পর্ষদ বাতিলের সিদ্ধান্ত জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলম, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব, আব্দুস সালাম, এস এম আব্দুল হালিম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাসুদ রহমান।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শুরু ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই।
অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময় পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগ্রুপ এস আলম নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে এই ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে নিয়েছে।
ফলে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর ইসলামী ব্যাংকেও আন্দোলন শুরু হয়। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে এস আলমের প্রভাবমুক্ত করতে আন্দোলন করেন ব্যাংকটির কয়েকশ কর্মী। এ ঘটনা ঘিরে ব্যাংকটির সামনে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে, যাতে গুলিবিদ্ধ হন অন্তত ৭ জন।
এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক অগাস্টেই এস আলমের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ইসলামী ব্যাংকে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়; যাদের মধ্যে নতুন চেয়ারম্যান করা হয় সাবেক ব্যাংকার মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে। তবে এমডি হিসেবে থেকে যান মুনিরুল মওলা, যিনি দায়িত্ব পান ২০২১ সালে।
মুনিরুল মওলাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে। তার জায়গায় ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পান ওই সময় ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকা ওমর ফারুক খান।
এরপর একই বছরের জুলাই মাসে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে জোবায়দুর রহমানকে দায়িত্ব দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পান।
জোবায়দুর রহমান দায়িত্ব পাওয়ার পরের মাসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান চলতি দায়িত্বে থাকা ওমর ফারুক খান। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিলে ওমর ফারুক খানকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। সবশেষ ২৪ মে সরে দাঁড়ান চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জোবায়দুর রহমান।





আপনার মতামত লিখুন