যানজট কমাতে মোড় বন্ধ করে ইউটার্ন চালু, ঢাকার সড়কে ফিরছে গতি
রাজধানী ঢাকার যানজট যেন এই শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্যাপসা গরমে সড়কে আটকে থাকা নগরবাসীর জন্য প্রায় নিত্যদিনের বাস্তবতা। সকাল থেকে শুরু হওয়া যানজট অনেক এলাকায় চলে গভীর রাত পর্যন্তও। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি কোনোবারই। তবে এবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে যানজটের নগরীর সড়কে কিছুটা গতি ফিরিয়েছে ৭০টি ইন্টারসেকশন।
সম্প্রতি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ৭০টি মোড় বা ইন্টারসেকশনে আনা হয়েছে বিশেষ পরিবর্তন। এসব মোড়ের আগে কিংবা পরে চালু করা হয়েছে ইউটার্ন ব্যবস্থা। আগে যেখানে তিন বা চারমুখী সড়কে চলাচলে সিগন্যাল বন্ধের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহনের জট তৈরি হতো, সেখানে এখন তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক গতিতে চলছে গাড়ি। এতে কমছে যানজট, ফলে লাঘব হয়েছে জনভোগান্তি।
সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কয়েকটি ইন্টারসেকশনে দেখা গেছে, নতুন ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি চতুর্মুখী মোড়ে এক বা একাধিক সড়কের মুখ বন্ধ রেখে সুবিধাজনক স্থানে ইউটার্ন স্থাপন করা হয়েছে। ফলে ইউটার্ন নেওয়া গাড়ি ও সিগন্যাল অতিক্রম করা গাড়িগুলো চলন্ত অবস্থায় থাকছে। ইউটার্নের কারণে অন্য রুটে গাড়ি চলাচলেও কোনো বাধার মুখে পড়ছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন মোড় বা ইন্টারসেকশন ঘুরে দেখা গেছে, সংসদ ভবন সংলগ্ন আড়ং সিগন্যালে পরিবর্তন আনা হয়েছে। গাবতলী থেকে নিউমার্কেটগামী যানবাহন সংসদ ভবনের সামনে ইউটার্ন নিয়ে সরাসরি চলে যাচ্ছে। এতে ধানমন্ডি থেকে গাবতলীগামী সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকছে। ফার্মগেট থেকে গাবতলী বা নিউমার্কেট থেকে ফার্মগেটগামী যানবাহনগুলো একটি সিগন্যালের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে আড়ংয়ের মোড়ে আর আগের মতো দীর্ঘ যানজট নেই।
আড়ং সিগন্যাল থেকে কিছুটা এগিয়ে গেলে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের সিগন্যাল। সেখানেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। আগে আড়ংয়ের দিক থেকে আসা শংকরগামী যানবাহন ধানমন্ডি ২৭ সিগন্যাল অতিক্রম করে যেতে হতো। এতে ধানমন্ডি থেকে গাবতলী বা ফার্মগেটগামী গাড়িগুলো সেই মোড়ে অতিরিক্ত সময় আটকে থাকতো। বর্তমানে পথটি বন্ধ করে সোবহানবাগ মসজিদের সামনে ইউটার্ন দেওয়া হয়েছে। ফলে যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না এবং বন্ধ হয়েছে জট।
এছাড়া রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুটি এবং শাহবাগে একটি রাস্তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ দুই জায়গায় নতুন করে চালু করা হয়েছে দুটি ইউটার্ন। শাহবাগে বারডেম হাসপাতালের সামনের সিগন্যালটি বন্ধ করে ঢাকা ক্লাবের সামনে ইউটার্ন দেওয়া হয়েছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কাঁটাবনমুখী যানবাহনগুলো ঢাকা ক্লাবের ইউটার্ন থেকে ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।
নিউমার্কেট থানা মোড় থেকে নিউমার্কেটগামী গাড়িগুলো এখন ইডেন কলেজের সামনের ইউটার্ন থেকে ঘুরে আসতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে নীলক্ষেত মোড়ে সড়কটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিজয় সরণি ট্রাফিক সিগন্যালেও একটি সড়ক বন্ধ করে ফার্মগেট সংলগ্ন এলাকায় তৈরি করা হয়েছে ইউটার্ন। এ ব্যবস্থার ফলে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে কমেছে যানজট।
নতুন এই সিস্টেমের বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে ফার্মগেট বাস পয়েন্টে গাড়ির অপেক্ষায় থাকা জোবায়ের মাহমুদ নামে একজন পথচারী বলেন, ‘আমাদের জন্য বেশ উপকার হয়েছে বলা যায়। আগে ধরেন শাহবাগ সিগন্যাল পার হতে কত সময় লাগবে তার ঠিক ছিল না। আর এখন জ্যামে পড়লে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। খুব সহজেই শাহবাগ সিগন্যাল পার হয়ে যেতে পারি।’
শ্যামলী থেকে নিয়মিত ধানমন্ডি যাতায়াত করেন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, যখন আড়ংয়ের সিগন্যাল সরাসরি পার হওয়া যেতো তখন একটা সিগন্যাল চালু থাকলে বাকি তিনটা রোড বন্ধ থাকতো। এখন একটা সিগন্যাল বন্ধ করে ইউটার্ন করে দেওয়ার কারণে একসঙ্গে চারটা রাস্তার গাড়িই চলাচল করতে পারে। আগে একবার সিগন্যাল বন্ধ করলে তিন দিকের গাড়ি যাওয়ার পর সিগন্যাল ছাড়তো। এখন আর অনেকক্ষণ সিগন্যালে বসে থাকতে হয় না। সবদিকের গাড়িই যাতায়াত করতে পারে। এটা অবশ্যই মানুষের চলাচলের জন্য অনেকটা ভালো কাজ হয়েছে।
গাবতলী-নিউমার্কেট রুটে চলাচলকারী একটি পরিবহনের চালকের সহকারী বলেন, আগে আড়ং মোড়ের সিগন্যাল পার হতে দু-তিনবার সিগন্যাল ধরতে হতো। এখন সংসদ ভবনের সামনে ইউটার্ন থাকায় গাড়িগুলো সিগন্যালে থেমে থাকতে হয় না। চলন্ত অবস্থায় থাকে। যদিও সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে ইউটার্ন নিতে হয় তারপরও ভালো জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।
ওয়েলকাম গাড়ির একজন চালক বলেন, ‘অনেক রাস্তা বন্ধ করে ইউটার্ন করে দেওয়ায় এসব জায়গায় এখন জ্যামে বসে থাকতে হয় না। জ্যাম হয় তবে তুলনামূলক অনেক কম সময়ে আমরা সিগন্যাল পার হয়ে যেতে পারি।’
রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাফিক সিগন্যালে দায়িত্বরত একজন ট্রাফিক পুলিশ বলেন, ইন্টারসেকশনের মাধ্যমে ইউটার্নগুলো করার কারণে গাড়িগুলো রানিংয়ের ওপর থাকে। সেক্ষেত্রে যেখানে ঘন ঘন ইউটার্ন আছে সেখানে ঘন ঘন ক্রসিং আছে। ঘন ঘন ক্রসিং হলে এক্সট্রা জনবল লাগছে, এক্সট্রা সময় যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে যানবাহন যদি একটা মুভমেন্টে থাকে তাহলে সেটা অবশ্যই যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবেই।
কারওয়ান বাজার ট্রাফিক সিগন্যালে দায়িত্বরত আরেকজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বলেন, ইন্টারসেকশনের কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থায় উন্নতি হয়েছে। গাড়িগুলো চলন্ত অবস্থায় থাকছে। ইউটার্নের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে যানজট হচ্ছে না।
ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র পাঁচ কিলোমিটারে। তবে ইন্টারসেকশন চালুর পর ২০২৫ সালে ঢাকার সড়কে গড় গতি বেড়ে হয়েছে ১০ কিলোমিটার। একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় যানজটও অনেকাংশে কমেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার ট্রাফিক বিভাগে যোগ দেন। এরপর থেকেই রাজধানীর যানজট কমাতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ভিডিও নজরদারি ও ডিজিটাল মামলা বৃদ্ধির পাশাপাশি ৭০টি ইন্টারসেকশনের নতুন বিন্যাস করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার হিসেবে নতুন কেউ যোগদান না করা পর্যন্ত মো. সরওয়ার সেই দায়িত্ব পালন করছেন।




আপনার মতামত লিখুন