ছিলোনা ওভারমার্কিং, শিক্ষার মান নিশ্চিত
গণিতে ভরাডুবি: এসএসসিতে ফল বিপর্যয়ের কয়েক কারণ
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এবার ভয়াবহ ফল বিপর্যয় হয়েছে। বিগত বছরের চেয়ে এবার পাসের হার কমেছে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। গত ১৬ বছরের রেকর্ডেও এমন কড়াকড়ি ছিল না। মূলত গণিত বিষয়ে ফেল করার কারণে এবার ফলাফল খারাপ করেছে অধিকাংশ বোর্ড। যে শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা গণিত বিষয়ে ভালো করেছে, সেখানে গড় পাসের হারও বেড়েছে। তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই জানিয়েছেন মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তাদের মতে- শিক্ষা ব্যবস্থা কড়াকড়ি হলে সবাই পড়ালেখাই মনোযোগী হবে।
গত কয়েক বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বেড়েই চলেছিল। তবে এবার সেই ধারায় বড়সড় ছেদ পড়েছে। চলতি বছরের ফলাফল গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। শিক্ষা বোর্ডগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাসের হার কমেছে ১৪.৫৯ শতাংশ। আর জিপিএ ৫ গত বছরের তুলনায় কমে গেছে ৪৩ হাজার ৯৭ জন।
বোর্ড ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলের পেছনে ৪টি বড় কারণ রয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকজন শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও বোর্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও একই রকম তথ্য উঠে এসেছে।
প্রথম কারণ:
এবার কোনো রকম বাড়তি নম্বর বা ওভারমার্কিং করা হয়নি। যা শিক্ষার প্রকৃত মান নিশ্চিততে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এবার শিক্ষকদের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল- উত্তরপত্রে যা প্রাপ্য, শুধু সেটাই দিতে হবে। ফলে এবারের ফলাফলকে বলা হচ্ছে ‘প্রকৃত মূল্যায়ন’। আগের বছরগুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই নম্বর ‘উদারভাবে’ দেওয়া হতো, বিশেষ করে পাস নম্বর বা জিপিএ ৫-এর কাছাকাছি নম্বর হলে তা বাড়িয়ে দেওয়া হতো। এবার সেটি করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত কারণ:
প্রায় অধিকাংশ বোর্ডেই শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে খারাপ করেছে গণিতে। বিশেষ করে এবার মফস্বল বা গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শহরের তুলনায় গণিতে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বরিশাল ও ময়মনসিংহ বোর্ডে গণিতে পাসের হার ছিল সবচেয়ে কম- প্রায় ৬৪ শতাংশ। এসকল অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের ওপর গণিত বিষয় বড় প্রভাব ফেলেছে।
তৃতীয় কারণ:
পাশের হারে বড় বিপর্যয়ের তৃতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দেশে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বা রাজনৈতিক অস্থিরতা। ওই সময় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পাশাপাশি আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেয়। কারো কারো মধ্যে মানসিক চাপ বা ট্রমাও কাজ করেছে। পড়ালেখায় পড়েছে ধস। কেউবা আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় পড়ার টেবিলে সময় দিয়েছে কম।
চতুর্থ কারণ:
কথিত নতুন কারিকুলামের নামে শিক্ষা ব্যবস্থায় হঠাৎ করে একটি বড় ধাক্কা দেয় তৎকালীন শিক্ষাখাত। যা ছিলো তুমুল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, যেটাকে কারিকুলাম অস্থিরতাও বলা হয়। যারা এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, তারা নবম শ্রেণিতে ছিল নতুন কারিকুলামে। কিন্তু দশম শ্রেণিতে গিয়ে আবার ফিরতে হয় পুরনো পাঠ্যক্রমে। ফলে দুই বছর দুই রকম বই ও অগোছালো পদ্ধতিতে পড়ে এসএসসি পরীক্ষা দিতে হয়েছে পুরনো কাঠামোতেই, পূর্ণ নম্বর ও সিলেবাসে। এতে শিক্ষার্থীরা মানিয়ে নিতে পারেনি। যা স্বাভাবিকভাবেই তাদের উপর বেশ প্রভাব ফেলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষা গবেষক বলেন, “মূলত এমনটাই হওয়া দরকার এবং আরও আগেই প্রয়োজন ছিল। ফল যেটা হয়েছে, সেটাই হওয়া উচিত। আগে যেভাবে ওভারমার্কিং হতো, সেটা শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দিত। এবার প্রকৃত মূল্যায়ন হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কারিকুলাম পরিবর্তনের চাপও ছিল। গণিত ও ইংরেজি শিক্ষকের সংকটও তাদের পিছিয়ে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যারা প্রাইভেট ও কোচিংয়ে যেতে পারে, তারা কিছুটা ভালো করে। কিন্তু গ্রামীণ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ পায় না। ফলে শিখনবৈষম্য থেকেই যাচ্ছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেরও ঘাটতি আছে।”
মূলত গত ১৫ বছরে সরকার পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলকে একটি ‘সাফল্যের বার্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অনেক সময় শিক্ষকদের চাপ দিয়ে নম্বর বাড়াতে বাধ্য করা হয়েছে। এর ফলে ফলাফল দেখে সন্তুষ্ট হলেও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন নিশ্চিত হয়নি। বরং তাদের মেরুদণ্ড দুর্বল করা হয়েছে।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ:
বরিশাল বোর্ডে এবার সবচেয়ে কম পাসের হার ৫৬.৩৮ শতাংশ। এই বোর্ডে গণিতে পাস করেছে মাত্র ৬৪.৬২ শতাংশ।
ময়মনসিংহ বোর্ডেও পরিস্থিতি প্রায় একই পাসের হার ৫৮.২২ শতাংশ, গণিতে ৬৪.২৭ শতাংশ।
ঢাকা বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৭৫.১৪,
রাজশাহীতে ৮৬.৫২,
যশোরে ৮৫.০২,
চট্টগ্রামে ৮১.৫৩,
সিলেটে ৮৩.১৭,
কুমিল্লায় ৭২,
দিনাজপুরে ৭১.৩৫,
আর মাদরাসা বোর্ডে ৭৯.৭৩ এবং কারিগরি বোর্ডে ৮৮.৭২ শতাংশ।
কী বলছে শিক্ষা বোর্ড:
আন্ত: শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাবকমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা এবার কোনো গ্রেস মার্কস বা বাড়তি নম্বর দিইনি। শিক্ষকদের বলে দেওয়া হয়েছিল, উত্তরপত্রে যা প্রাপ্য, কেবল সেটাই দেবেন। এটি শতভাগ মেধাভিত্তিক ফলাফল।’
তিনি আরো বলেন, ‘এবার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি। সমঝোতার ভিত্তিতে পরিচালিত ৭৩টি কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে নকলের সুযোগও অনেক কমেছে।’
বরিশাল বোর্ডের ফল বেশি খারাপ হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে প্রান্তিক ও খাল-বিলঘেরা এলাকা বেশি। শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা তুলনামূলক কঠিন। আবার আমরা দেখেছি, মহানগরের বাইরে উপজেলায় গেলে পাসের হার স্বাভাবিকভাবেই কমে। কারণ শহরে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি, তারা ফলাফলে এগিয়ে থাকে।’
তবে এই পরিবর্তন অনেকেই ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে- “এতোগুলা বছর আমরা দেখতাম পরীক্ষা দিলেই পাশ, ক্লাস না করেও পাশ। এমনকি পরীক্ষায় উপস্থিত না হয়েও A+ পেয়ে যায়। কিছু কিছু সময় ৫ লক্ষ টাকাশ A+ কিনতেও দেখা গেছে। তবে এবার তার লেশমাত্র আমরা দেখিনি। যদি এভাবে কঠোরতার সাথে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয়, তাহলে নিশ্চিত থাকেন শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মনোযোগী হবে।”




আপনার মতামত লিখুন