স্বামী-শাশুড়ী-ননদ-ভাগ্নী বাদ রাখেনি কেউ
যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূকে পৈশাচিক নির্যাতন, শাস্তির দাবি
বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকেই গৃহবধূ বা স্ত্রীকে নির্যাতন যেনো একপ্রকার ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে। অভাব নেই আইনের, আছে আদালতের নিবিড় পর্যবেক্ষণ। তবুও থেমে নেই গৃহবধূ ও নারী নির্যাতন। মোছাঃ স্মৃতি আক্তারও সেই নির্যাতিত, অসহায়, অবলা নারীদের দলেরই একজন। তবে তার উপর নির্যাতনের প্রধান কারণ- সুদের রমরমা ব্যবসায়ের জন্য চতুর্থ দফায় মোটা অঙ্কের টাকা দিতে না পারা।
শুনতে অবাক হচ্ছেন ???
দেশের আরও দশজন মেয়ের মতোই সুন্দর একটি জীবন ও সোনালী সংসারের আশায় মোঃ জহিরের সাথে ২০২০ সালে শরিয়া মোতাবেক বিয়ে হয় স্মৃতির। তবে বিয়ের পরক্ষণেই স্মৃতি আচ করতে পারে- তার কপালে হয়তো সুখ নাম অদৃশ্য পাখিটা ধরা দিবে না। তবুও মেয়ের একটু সুখের জন্য স্মৃতির বাবা-মা শতকষ্ট করে স্মৃতির স্বামীকে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ টাকার ফার্নিচার উপহার দেন। যার প্রমাণ মেলে জহিরের বাড়িতেই। তবে এতে তাদের মন ভরে না। তারা দাবি করে ৫ লক্ষ টাকা। ঘটনা এখান থেকেই জটিল আকার ধারণ করে।
ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারী মোছাঃ স্মৃতি আক্তার নারায়নগঞ্জ জেলা রূপগঞ্জ উপজেলার ছাতিয়ান গ্রামের মোঃ ফাকের আলীর মেয়ে।
আর অভিযুক্ত মোঃ জহির রাজধানীর ডেমরা থানার (সারুলিয়া) টেংরা-৯২/৮ এলাকার মৃত মোঃ আক্কাস আলীর ছোট ছেলে।
বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনায় ভুক্তভোগী স্মৃতি আক্তার বলেন, ‘জহিরের সাথে আমার ২০২০ সালে বিয়ে হয়। শুরু থেকেই ওদের ফ্যামিলি আমাদের কাছে যৌতুক চেয়ে আসছিল। কিন্তু আমাদের এতোটা আর্থিক অবস্থা ভালো না। তবুও আমরা যতটুকু পারি দফায় দফায় তাদেরকে টাকা দিয়েছি, প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ টাকার ফার্নিচার দিয়েছি। এমন প্রায়শই আমি বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে জহির ও আমার শাশুড়ীকে দিয়েছি। বাসার কাজের মেয়ের মতো সকল কাজও আমিই করি। তবুও একটু এদিকওদিক হলেই আমাকে সবাই চাকরানির মতো মারধর করে। আমার স্বামী জহির, শাশুড়ী জারিয়া বেগম, আমার ননদ হাসিনা বেগম, ননদের মেয়ে আনুশকা কারো হাত থেকে আমি রেহাই পায়নি। এমনকি তৃতীয়বার টাকা বেশি দিতে পারিনি বলে- আমার কানের স্বর্ণের দুলসহ প্রায় দেড় লক্ষ টাকার গহনা আমার শাশুড়ী অর্থাৎ জহিরের মা নিয়ে নেয়। প্রতিবাদ করায় শুরু হয় যৌথভাবে নির্যাতন। মার খেয়ে অসুস্থ হয়ে আমি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিই।’
পুত্রবধূকে বেধড়ক পেটানোর বিষয়ে ভুক্তভোগী স্মৃতি বলেন, ‘আমার স্বামী জহির আমাকে বিয়ের আগেও একটা বিয়ে করেছিলো। জহির ও তার মায়ের অত্যাচারে প্রথম স্ত্রী তাকে তালাক দেয়। ওই ঘরের একটা মেয়ে ছিলো। সেই মেয়েটার দায়িত্বও জহিরের পরিবার নেয়নি। মূলত জহির নিয়মিত মাদক সেবন বা নেশা করার কারণে সংসারে অশান্তি হয়। সেইসাথে জহিরের মায়ের স্বৈরাচারী শাসনে সেই মেয়েটা অতিষ্ঠ হয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। অথচ জহির আমাকে বিয়ের সময় প্রথম স্ত্রীর কথা গোপন রাখে। বিয়ের পর আমি এ বিষয়টা জানতে চাইলেই জহির ও তার মা, অর্থাৎ আমার শাশুড়ী আমাকে বেধড়ক মারধর করে।’
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। জহিরের মায়ের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অনেকেই পরিচয় গোপন রেখে স্বাক্ষী দিয়েছেন। সুদের রমরমা বাণিজ্যের লেডি হিটলার খ্যাত মোছাঃ জারিয়া বেগমের ফিরিস্তি বর্ণনা করেন তারা। এবিষয়ে ভুক্তভোগী স্মৃতির জবানবন্দির সাথে স্থানীয়দের বর্ণনা পুরোপুরি মিলে যায়। তাছাড়া স্মৃতির উল্লেখ করা সাড়ে ৩ লক্ষ টাকার ফার্নিচার জহিরের বাসায় এখনো বিদ্যমান। যা সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে সরেজমিনেও প্রমাণ মেলে।
স্মৃতি আক্তার জানান, ‘২০২০ সালে বিয়ের পর থেকে আমি অনেকবার আমার স্বামী ও শাশুড়ীকে টাকা দিয়েছি। আমার স্বামী নিয়মিত নেশা করে অনেক টাকা নষ্ট করেছে। জহির এখনো নেশা করে। কিন্তু এই বছর আমার শাশুড়ী সুদের ব্যবসায়ের জন্য আমার কাছে ৫ লক্ষ টাকা চাই। পারবে না জেনেও আমি নিরুপায় হয়ে আমার বাবার কাছে টাকা চাই। কিন্তু আমাদের সে সামর্থ নেই। সুদের ব্যবসায়ের জন্য টাকা দিতে না পারায় আমার স্বামী এবং শাশুড়ী গত ১৭ জুলাই সকাল সাড়ে আটটার দিকে আমাকে আবারও মারে। এমনকি আমার ননদ হাসিনা বেগম ও তার মেয়ে আনুশকাও আমাকে মেরে চুলের মুঠি ধরে পুরো ঘরে টেনে নিয়ে যায়। ওদের পরিবারের সবাই আমাকে মারে। প্রাণ বাঁচাতে জহিরের বাসা থেকে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে আসি। বাসায় এসে সুস্থ না হলে পরবর্তীতে হাসপাতালে যেয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হই।’
নেশাগ্রস্ত স্বামী জহিরের বিষয়ে ভুক্তভোগী স্মৃতি আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী জহির একটা দিনও মাদক ছাড়া থাকতে পারে না। নিষেধ করলেই পৈশাচিক নির্যাতন করে। সে কোনো কাজও করে না। জহির এবং তার মা এই সুদের ব্যবসা করেই চলে। এসব অবৈধ ব্যবসা করতে নিষেধ করায়- ২০২০ সালে আমি ৪ মাসের গর্ভবতী থাকা অবস্থায় আমার স্বামী জহিরুল ইসলাম এবং আমার শাশুড়ী জারিয়া বেগম আমাকে মেরে ফেলতে যায়। আমি তাদের পায়ে ধরে প্রানভিক্ষা চাইলে কোনোমতে বেঁচে যায়, কিন্তু আমার উপর অত্যাচার এখনো বন্ধ হয়নি। এবার যেহেতু আমি গণমাধ্যমে এসব কথা জানিয়েছি, তাই ওদের বাড়িতে গেলে আমাকে এবার মেরেই ফেলবে। আমার একটা বোন ওদের আত্মীয়র সাথে বিয়ে দেয়ার পর তাকে টর্চার করে মেরে ফেলে। একইভাবে আমি ওদের হাতে মরতে চাই না। এদেশের আইন-আদালতের কাছে আমার জীবনের নিরাপত্তা চাই।’
অভিযুক্ত জহির, তার মা জরিয়া বেগম সম্পর্কে টেংরায় অনুসন্ধান করি আমরা। জহিরের বেপরোয়া আচরণ ও তার মা জারিয়া বেগমের সুদের ব্যবসা সম্পর্কে প্রতিটি লোকই নেতিবাচক মন্তব্য করেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে- জারিয়া বেগম সুদের টাকার জন্য যা কিছু করতে পারে। নিজের ছেলে বা পুত্রবধূকে সে কোরবানি করতেও দ্বিধাবোধ করবে না। এমনকি জারিয়া বেগমের অত্যাচারেই তার আরেকটি ছেলে সংসার আলাদা করে উপরে থাকে।’
নিজের মা-বোন-ভাগ্নী সহ স্ত্রীকে মারধর ও সুদের টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত জহির গণমাধ্যমে বলেন, “আমার স্ত্রী স্মৃতি আক্তার সব সত্য বলেনি। আমার কথা না শোনায় আমি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে একদিন মেরেছি। তবে তার কাছে আমি কোনো যৌতুক দাবি করিনি এবং কোনো টাকাও নিইনি।”
অবশ্য জহিরের মা, বোন, ভাগ্নী মিলে ভুক্তভোগী স্মৃতিকে মারধরের বিষয় অস্বীকার করেন। তারা বলেন, আমাদের নামে যা বলা হচ্ছে তা অপবাদ। তবে সংসারে থাকলে ঝগড়া হবে এটা স্বাভাবিক।
স্ত্রীকে এমন অমানুষিক নির্যাতন ও সুদের টাকার জন্য অত্যাচারের বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে Human Rights Support Society (HRSS) এর মুখ্য সংগঠক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, স্মৃতির স্টেটমেন্ট অনুযায়ী জহিরের পরিবার নিঃসন্দেহে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। তাছাড়া আমাদের দেশে নারী শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে। কোনো স্ত্রীকে বা নারীকে শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতনের কোনো অজুহাত থাকতে পারে না। সেখানে সুদের টাকার জন্য এমন নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে অতিশীঘ্র তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এ-বিষয়ে ডেমরা থানার দায়িত্বরত অফিসার বলেন, এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে আমরা কোনো অভিযোগ পায়নি। থানায় অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সংবাদটি আপডেট হয়েছে।




আপনার মতামত লিখুন