মাদক কারবারি চক্রের দাপট
জমি বিরোধের জেরে স্বাক্ষীকে হত্যা চেষ্টা, মুমূর্ষু অবস্থায় মেডিকেলে ভর্তি
রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গায় মোঃ আনোয়ার মুকিত (৫৫) কে হত্যার উদ্দেশ্যে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে মোসাঃ শিরিন বেগমের দায়েরকৃত মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে। যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে এলাকায়। আনোয়ার মুকিত বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অর্থোপেডিক্স সার্জারির ৩১ নং ওয়ার্ডের ৪ নং বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনা সূত্রে জানা যায়, বুধবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা আনুমানিক ৬ টার সময় আনোয়ার মুকিত কাশিয়াডাঙ্গা থেকে মন্টুর ঢালুতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে শান্তির মোড় পার হয়ে মন্টুর ঢালুর নিকট আজাদ হাজীর বাড়ির পাশে পৌঁছালে হঠাৎ করে ৫ জন লোক আনোয়ার মুকিতকে লাঠি, হকিস্টিক ও লোহার রড নিয়ে আক্রমণ করে। মূলত জমি সংক্রান্ত বিবাদের জেরে সেলিনা বেগম, তার ছেলেরা ও গ্যাংদের নিয়ে এই আক্রমণ হয় বলে জানা যায়।
ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে তথ্য নিয়ে যাওয়া হয় রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি মৃতপ্রায় আনোয়ার মুকিতের কাছে। ভুক্তভোগী আনোয়ার মুকিত বলেন, “আমার অবস্থা ভালো না। যেকোনো সময় আমি মারা যেতে পারি। আমি গতকাল সন্ধ্যা ৬ টার দিকে মন্টুর ঢালুর দিকে যাচ্ছিলাম। ঢালুর নিকট আজাদ হাজীর বাড়ির পাশে পৌঁছালে দেখি জনি, সজিব, আজানুর, নিরব, সেলিনা মোট ৫ জন আমাকে ঘিরে ধরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিরিন বেগমের মামলার আসামি জনি অরফে ইয়াবা জনি লোহার রড দিয়ে আমার পায়ে আঘাত করে। যার ফলে প্রচুর রক্তপাত হয়। নিরব ও জনির বন্ধু সজিব আমাকে হকিস্টিক দিয়ে দুই হাতে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে, যার ফলে আমার ডান হাত ভেঙে যায় এবং বাম হাত থেতলে যায়। অন্যদিকে আজানুর অরফে গাইন্জোটি আজানুর যিনি কয়েকটি মামলার আসামি- লাঠি দিয়ে আমার মাথায়, পিঠে ও শরীরের বিভিন্ন যায়গায় আঘাত করে। যার ফলে আমার মাথা দিয়ে রক্তপাত শুরু হয়। এ-সময় আমি মাটিতে পড়ে গেলে নিরব আমার বুকের উপর উঠে চেপে ধরে। এমতাবস্থায় সেলিনা পাশ থেকে আমাকে বলে- ‘তুই শিরিন ও আন্নির মামলায় স্বাক্ষী দিবি, এর ফল আজ তোকে ভোগ করতে হবে। মেরে ফেলার আগে তোরা সবাই মুকিতকে ঠিকমতো পিটা।’ যার ফলে জনি, আজানুর ও সজিব তাদের মারের গতিতে বাড়িয়ে দেয়। সেইসাথে নিরব আমার বুকের উপর উঠে বসা অবস্থায় আধা ভাঙা ইট দিয়ে আমার মাথায়, কপালে, চোখের নিচে, বুকে অনবরত আঘাত করতে থাকে। আর এই লোমহর্ষক সম্পূর্ণ ঘটনা দেখে ফেলে বাবু এবং কালু নামের দু’জন স্থানীয় ব্যক্তি।”
জানা যায়, প্রত্যক্ষদর্শী বাবু এবং কালু চিৎকার করে আশেপাশের লোকজনকে ডাকতে থাকলে অপরাধীরা বাবু এবং কালুকে ধাক্কা মেরে দ্রুত পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বাবু এবং কালু ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে তার পরিবারকে জানালে ভুক্তভোগীর স্ত্রী, মেয়ে ও আত্নীয় স্বজন আনোয়ার মুকিতকে মুমূর্ষু অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।

সন্দেহ স্পষ্ট করে আনোয়ার মুকিত বলেন, “আমি নিশ্চিত আমাকে মেরে ফেলার জন্যই সেলিনা বেগম ও নিরবের নেতৃত্বে ওরা এই হামলা করে। কারণ সেলিনা আমার শাশুড়ির জমি করায়ত্ত করার জন্য আমাকে কয়েকবার বলেছে সবাধান হয়ে যেতে, মামলার স্বাক্ষী না হতে। নিরবও একইভাবে হুমকি দিয়েছে একাধিকবার। কিন্তু মামলার স্বাক্ষী হওয়ার কারণেই ওরা আমার উপর ক্ষিপ্ত। তাই সেলিনা-নিরব ও তার ছেলেদেরকে সাথে নিয়ে আমার এই অবস্থা করেছে। ওরা আমাকে আগে থেকে বলতো- তোকে, তোর মেয়ে-জামাই, তোর পরিবারকে মেরে ফেললে আমাদের রাস্তা ক্লিয়ার। তাই আমাকে এদিন হত্যার উদ্দেশ্যেই ওরা আক্রমণ করে। কিন্তু স্থানীয় লোকজন দেখে ফেলায় হয়তো এবার পারেনি। তবে ভবিষ্যতে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমরা সবাই এখন আতঙ্কে আছি। আমি চাই- ওই চক্রের সবাইকে কঠিন শাস্তি দেয়া হোক।”
এবিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, আনোয়ার মুকিতের ডান হাত ভেঙে গেছে, বাম হাত বাজেভাবে থেতলে গেছে। তার পায়ের মাংসপেশিতে ক্ষত হয়ে গর্ত হয়ে গিয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন যায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিশেষ করে মাথা এবং পা থেকে অনেক রক্ত ঝরেছে। সবমিলিয়ে তার সুস্থ হতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে, কাশিয়াডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি অবগত হয়েছি। তবে থানায় এখনো কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ে বসবাসরত সেলিনা বেগম ও তার ছেলেদের মাদকের স্বর্গরাজ্য নিয়ে। তাদের সাথে মিশে বিপথে যাওয়া ছেলে নিরবকে নিষেধ করেন মা শিরিন বেগম। এতেই ছেলে এবং বোন মিলে শত্রুতে পরিনত হয়- যা রূপ নেয় জমির দ্বন্দ্বে। তখন সকল ওয়ারিশদের জমি না দিয়ে গোপনে কয়েকজন মিলে জমি লিখে নিতে পায়তারা শুরু করে তারা। জমির মালিক গোলেনুর বেওয়া অতিশয় বৃদ্ধা ও মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় নিরব তার খালা ও খালাতো ভাইদের সাথে নিয়ে আপন মা-বোন-ভাই ও অসহায় এতিম মেয়ে আন্নিকে ফাঁকি দিয়ে গোলেনুরকে ভুল বুঝিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে নিতে ষড়যন্ত্র শুরু করে। জানাজানি হলে অন্যান্য ওয়ারিশরা আদালতের দারস্থ হয়ে মামলা দায়ের করেন। যার স্বাক্ষী ছিলেন আনোয়ার মুকিত সহ আরও কয়েকজন।
জমি দখল ও মাদক চোরাচালানের প্রতিবাদে এর আগেও নিরব, সেলিনা বেগম ও তার ছেলেরা মিলে বেধড়ক মারধর করে শিরিন বেগম ও আরেক ওয়ারিশ এতিম মেয়ে আন্নিকে। সঙ্গত কারণেই ভুক্তভোগীরা একাধিক মামলা করেন। শিরিন বেগম বাদী হয়ে বিগত ১৭ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞ সিএমএম আমলী কাশিয়াডাঙ্গা থানা আদালতে রাজশাহী তে দণ্ডবিধির ৩২৩/৩৪১/৩৫৪/৫০৬(||)/১০৯ ধারায় মামলা দায়ের করেছেন। পরবর্তী মামলা তুলে নিতে প্রাণনাশের হুমকি দিলে শিরিন বেগম আসামিদের বিরুদ্ধে থানায় একটি জিডি করেন- জিডি নং ১১০৩।
এছাড়া প্রতিবাদ করায় জমির প্রকৃত ওয়ারিশ এতিম মেয়ে আন্নি (২০) কেও বেধড়ক পিটিয়ে জখম ও শ্লীলতাহানি করে আসামিরা। ভুক্তভোগীর সাথে থাকা নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারও লুট করে তারা। গত ১৫ অক্টোবর রাতে রাজশাহীর পবা থানাধীন ওবাইয়ের মোড়ে এই ঘটনা ঘটে। আন্নি কাশিয়াডাঙ্গার মৃত মোঃ নাসিরুদ্দিন হিরার মেয়ে। বাধ্য হয়ে আন্নিও আদালতে দুইটি মামলা দায়ের করে। মামলার ধারা সমূহ- ১০৭, ৩২৩, ৩৫৪, ৩৭৯, ৫০৬, ৩৪। উপরোক্ত প্রত্যেকটি মামলার স্বাক্ষী আনোয়ার মুকিত।
মূলত রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ে অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধা গোলেনুর এর জমি তার মেয়ে সেলিনা বেগম ও নাতি নিরব গ্যাংদের চক্রান্তে প্রকৃত ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে জোরপূর্বক লিখে নেয়ার অপচেষ্টার ফলশ্রুতিতে বাগবিতণ্ডা ও মামলার ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী এতিম ও অসহায় আন্নি, শিরিন বেগম সহ বঞ্চিতরা আদালতের দারস্থ হয়। বাদীর অভিযোগের ভিত্তিতে রাজশাহীর বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত উক্ত জমির উপর ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারা জারি করেন। এছাড়াও আন্নির নিরাপত্তার জন্য ১০৭ ধারায় মামলা করেন আন্নি।
ইতোপূর্বে দায়েরকৃত মামলার আসামিরা হলেন- ১.মোসাঃ সেলিনা বেগম (৫৫), পিতা- মৃত নওসাদ আলী @ নওসের আলী মন্ডল, বর্তমান স্বামী- মোঃ নুর ইসলাম, প্রাক্তন স্বামী- মৃত সুবেদ আলী, ২. মোসাঃ শাহানাজ বেগম (৫২), পিতা- মৃত নওসাদ আলী @ নওসের আলী মন্ডল, ৩.মোঃ জনি (২৭), পিতা- মৃত সুবেদ আলী, ৪.মোঃ আজানুর (৩৩), পিতা- মৃত সুবেদ আলী, ৫.মোসাঃ হাজেরা খাতুন (২০), পিতা- মৃত নাসির উদ্দিন হীরা, ৬.মোঃ নিরব (২৬), পিতা- মোঃ আনোয়ার মুকিত, ৭.মোসাঃ আঁখি বেগম (২১), স্বামী মোঃ নিরব, ৮। সামারুল (৩৫), পিতা মৃত সুবেদ আলী- সর্বসাং: ৪৪, কাশিয়াডাঙ্গা, থানা- কাশিয়াডাঙ্গা, মহানগর রাজশাহী।
উল্লেখ্য, ৮৩ বছর বয়সী অসুস্থ বৃদ্ধা মানসিক ভারসাম্যহীন গোলেনুর নিজ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নেই। সেই সুযোগেই গোলেনুর এর মেয়ে সেলিনা বেগম ও তার নাতি নিরব ষড়যন্ত্র করে আরও কিছু জালিয়াতি চক্রকে রাজি করিয়ে জমির প্রকৃত ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে গোপনে লিখে নেয়ার পায়তারা শুরু করে। যা প্রকাশ হতেই বাধে বিপত্তি।
কারণ মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে মিশে বিপথে যাওয়া নিরবের মা ও মূল ষড়যন্ত্রকারী সেলিনা বেগমের আপন বোন শিরিন বেগম। আরেক ওয়ারিশ আন্নি গোলেনুর এর আপন নাতনী এবং সেলিনা বেগমের ভাইয়ের মেয়ে ও বাটপার নিরবের মামাতো বোন। অথচ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রকৃত ওয়ারিশদের বঞ্চিত করে গোপনে মানসিক ভারসাম্যহীন গোলেনুরকে ভুল বুঝিয়ে জমি লিখে নেয়ার অপচেষ্টা শুরু করে চক্রটি। সকলকে আইন অনুযায়ী সমানভাবে অধিকার বুঝিয়ে দিতে বললেই ভুক্তভোগী শিরিন বেগমকে (১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর) তার বোন সেলিনা বেগমের উস্কানিতে নিরব বেধড়ক মারধর করে। সাথে ছিলো উল্লেখিত অভিযুক্তরা। ঠেকাতে গেলে আরেক ওয়ারিশ ও ভুক্তভোগী ইভাকেও মারধর করে তারা। পরবর্তীতে এতিম মেয়ে আন্নি সেখানে ঠেকাতে গেলে তাকেও নির্মমভাবে পেটানো হয়। যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম অনুসন্ধান সাপেক্ষে সত্যতা নিশ্চিত হয়ে সংবাদ প্রকাশ করে।
এবিষয়ে অভিযুক্তদের সাথে কথা বলতে গেলে দরজার ভিতর থেকে সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন তারা। ইতোপূর্বে জনি, নিরব, সেলিনা বেগম গ্যাংদের মাদক চোরাকারবারির বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের ওপর ব্যাপক ক্ষিপ্ত তারা। সাংবাদিকদের সাথে তারা কোনো কথা না বলে বাসা থেকে বের করে দেয়।




আপনার মতামত লিখুন