স্বামী প্রবাসে-স্ত্রী পরকীয়ায় ব্যস্ত, অনৈতিক-অবৈধ সম্পর্কের রামরাজত্ব
মাদারীপুরে একবছরে ৮ হাজার বিয়েতে ৫,৫০০ ডিভোর্স, কেন এত ভাঙন ?
প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসেবে পরিচিতি মাদারীপুরে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে পরকীয়া সম্পর্ক, স্বামী প্রবাসে থাকায় স্ত্রীর অবৈধ সুযোগ নেয়া, দাম্পত্যে বোঝাপড়ার অভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং দায়িত্বহীনতা।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাদারীপুরে মোট বিয়ে হয়েছে ৮ হাজার ১০৬টি, বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ৫ হাজার ৫২১টি। অর্থাৎ মোট বিয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশের সমান বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। আগের বছরগুলোর তুলনায় এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি-২০২৪ সালে ৪৬.৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৫৪.৩ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৪৩.৮ শতাংশ ছিল।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলায় বিয়ে হয়েছে ২ হাজার ২২৬টি এবং বিচ্ছেদ ২ হাজার ১৭৭টি- যেখানে বিয়ে ও বিচ্ছেদের ব্যবধান মাত্র ৪৯টি। শিবচরে বিয়ে ২ হাজার ৪৩১টি, বিচ্ছেদ ১ হাজার ২৩৭টি; কালকিনিতে বিয়ে ১ হাজার ৮২৮টি, বিচ্ছেদ ৯২১টি; আর রাজৈরে বিয়ে ১ হাজার ৬২১টি, বিচ্ছেদ ১ হাজার ৯৬টি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসে অবস্থানের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিনের দূরত্ব তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। এ সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে পরকীয়ার মতো ঘটনা ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গড়ায়।
দুঃখ প্রকাশ একজন প্রবাসী বলেন, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে স্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। দেশে ফিরে তিনি স্ত্রীর অন্য সম্পর্কে জড়িত থাকার প্রমাণ পান এবং পরে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী জানান, বিয়ের মাত্র ১৪ মাসের মাথায় তার সংসার ভেঙে যায়। স্বামীর পরকীয়া সম্পর্কের বিষয়টি জানার পর দাম্পত্য সম্পর্ক আর টেকেনি।
আরেক প্রবাসী জানান, জীবিকার তাগিদে বিদেশে গিয়ে তিনি নিয়মিত সংসারে টাকা পাঠাতেন। কিন্তু কয়েক বছর পর জানতে পারেন, তার স্ত্রী অর্থ ও স্বর্ণালংকার নিয়ে অন ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে। বর্তমানে সন্তানদের নিয়েই তিনি জীবনযাপন করছেন।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারদের মতে, বর্তমানে বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ পরকীয়া। এছাড়া দীর্ঘ প্রবাস জীবন, দাম্পত্য কলহ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রেই সামান্য ভুল-বোঝাবুঝি মিটিয়ে না নিয়ে দম্পতিরা বিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন।
আরেক বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার মাওলানা জাহিদ আলম বলেন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিচ্ছেদের হার আরও বাড়বে। তিনি পারিবারিকভাবে সম্পন্ন বিয়েতে বিচ্ছেদের হার তুলনামূলক কম বলেও উল্লেখ করেন এবং দাম্পত্য কলহে দুই পরিবারের ভূমিকা রাখার পরামর্শ দেন।
মাদারীপুর জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান সোহেল গণমাধ্যমে বলেন, বিবাহবিচ্ছেদ আইনগতভাবে স্বীকৃত অধিকার হলেও এর হার বৃদ্ধি সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, বিরোধ চরমে পৌঁছানোর আগেই মধ্যস্থতা ও পারিবারিক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে আইনজীবী অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন সরদার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পারিবারিক সহায়তা ও আর্থিক স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ম্যারেজ ও ডিভোর্স কনসালটেন্ট আলমগীর হোসেন বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে এবং বেকারত্বও বিচ্ছেদের বড় কারণ। মানসিক ও আর্থিক অপ্রস্তুত অবস্থায় দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন তৈরি হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছেদে গড়ায়।
জেলা রেজিস্ট্রার আমির হামজা বলেন, চলতি বছরে বিয়ের তুলনায় বিচ্ছেদের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি পরকীয়াকে এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী পরিবারে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা, দেশে অবস্থানরত স্ত্রীদের শালীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রাখা, পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদার করা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। সেইসাথে প্রয়োজন হলে অনৈতিক ও অবৈধ সম্পর্ক দমনে আইনের ব্যবহারও করতে হবে বলে মত সকলের।







আপনার মতামত লিখুন